সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের জামিনের বিষয়ে নিহত মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর করা একটি আপসনামা আদালতে উপস্থাপন করা হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলাটি আপসযোগ্য না হওয়ায় আদালত ওই আপসনামাকে জামিনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
বুধবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে গাজী নজরুল ও মাকছুদার জামিন আবেদনের শুনানি হয়। এ সময় মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ প্রথম পক্ষ এবং গাজী নজরুলের নিকটাত্মীয় মো. আব্দুল হামিদ মোড়লকে দ্বিতীয় পক্ষ দেখিয়ে তৈরি করা একটি আপসনামা আদালতে দাখিল করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, আপসনামাটি আদালত গ্রহণ করেননি। তার ভাষ্য, মামলা আপসযোগ্য না হওয়ায় বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলেও সেটির ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তি বা জামিন দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে বয়স ও নারী বিবেচনায় গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।
আপসনামায় কী বলেছেন মরিয়মের বাবা
আদালতে দেওয়া আপসনামায় মাসুম বিল্লাহ উল্লেখ করেন, তার মেয়ে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়েছিল। তার দাবি, বিয়ের পর গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সঙ্গেও মরিয়ম হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে সংসার করছিলেন।
আপসনামায় বলা হয়, ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে ঢাকার নিজ বাসভবনে মরিয়ম আত্মহত্যা করেন। পরে গাজী নজরুলের ফোন পেয়ে বিকেল সাড়ে ৬টার দিকে সেখানে গিয়ে মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন তার বাবা।
মেয়ের জামাইয়ের বাসায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটায় তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহ থেকে গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং আরেকজনকে আসামি করে শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করেন মাসুম বিল্লাহ।
তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারেন, গাজী নজরুল ও মাকছুদার প্ররোচনা কিংবা তাঁদের কোনো কর্মকাণ্ডে রাগ বা অভিমানের কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি, আপসনামায় এমনটাই উল্লেখ করেছেন তিনি।
জামিনে আপত্তি নেই পরিবারের
আপসনামায় মরিয়মের বাবা বলেন, গাজী নজরুল ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দ্বিতীয় পক্ষের ব্যক্তিরা আগে থেকেই নিকটাত্মীয়। দুই পক্ষের আত্মীয়স্বজনও পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় আলোচনার মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে আপসনামায় শর্ত দেওয়া হয়, শেরেবাংলানগর থানার ১৬ নম্বর মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলাম জামিন পেলে মরিয়মের বাবা বা তার পরিবারের কোনো আপত্তি থাকবে না।
এ ছাড়া আসামিরা জামিনে মুক্ত হলে উভয় পক্ষ পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবে এবং বিচারাধীন বিষয়ে নির্লিপ্ত থেকে আদালতের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলেও আপসনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার পটভূমি
গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে ৭৫ বছর বয়সী নজরুল জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন।
২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই রাতেই গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে মরিয়মের বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তাঁদের দুজনসহ মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মামলায় মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেন, গাজী নজরুলের সঙ্গে বিয়ের পর মরিয়ম নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা পরিবারকে জানিয়েছিলেন।
মামলাটিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গাজী নজরুলের দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছিল। রিমান্ড শেষে সোমবার তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে তদন্তকারী সংস্থা ডিবি।
আদালতে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজী নজরুল ন্যাম ভবনে তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী সঙ্গে বসবাস করতেন। সেখানে মাকছুদাকে নিয়ে থাকার সময় মরিয়ম কখনো কখনো নজরুলের শয়নকক্ষের পাশের বারান্দায় ঘুমাতেন। তদন্ত কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুলের কাছ থেকে মামলার ঘটনা সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে বুধবারের জামিন শুনানিতে মরিয়মের বাবার করা আপসনামা উপস্থাপন করা হলেও আদালত সেটি গ্রহণ করেননি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকীর বক্তব্য অনুযায়ী, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে দায়ের হওয়া এ মামলাটি আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়।








