মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

স্বচ্ছলতা ফেরাতে কম্বোডিয়ায় গিয়ে স্বপ্নের সমাধি: বৃহস্পতিবার ফিরছে ৪ প্রবাসীর নিথর দেহ

বিদেশ যাওয়ার আগে ছিল সরকারি ছাড়পত্র, পরিবারের চোখে ছিল স্বচ্ছলতার স্বপ্ন। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর কারও ঠিকানা হয়েছে চীনা নিয়ন্ত্রিত সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড, কেউ পড়েছেন চাকরির নামে প্রতারণার ফাঁদে। শেষ পর্যন্ত চার পরিবারের কাছে প্রবাস থেকে ফিরছে উপার্জন নয়, কফিন। বৃহস্পতিবার কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরবে চার বাংলাদেশির মরদেহ।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫ মিনিটে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঝিনাইদহের সোহাগ আহাম্মেদ (২৩), চুয়াডাঙ্গার আসিফ খান (২৪) এবং বগুড়ার জুয়েল হোসেনের (৫৩) মরদেহ ঢাকায় পৌঁছানোর কথা। রাতে আরেকটি ফ্লাইটে আসবে শাহনাজ তালুকদারের মরদেহ।

ঘটনাগুলোর বিবরণে মিল রয়েছে একটি জায়গায়, বিদেশে যাওয়ার আগে স্বজনেরা বৈধ প্রক্রিয়া ও চাকরির আশ্বাসের ওপরই ভরসা করেছিলেন। সোহাগ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে ২০২৫ সালের এপ্রিলে কম্বোডিয়া যান। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে চীনা নিয়ন্ত্রিত একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে পাচার করা হয়। দীর্ঘদিন বন্দিদশা ও নির্যাতনের পর ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।

ঝিনাইদহের শৈলকুপার বারইপাড়া গ্রামের সোহাগকে বিদেশ পাঠাতে তার পরিবার প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করেছিল। সেই টাকা জোগাড় হয়েছিল ঋণ ও সুদে। মৃত্যুর দুই দিন আগে ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল বাবা বিল্লাল হোসেনের। তার ভাষ্য, সোহাগকে স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগও দেওয়া হতো না। এখন ছেলের মরদেহের সঙ্গে পরিবারের ঘাড়ে রয়ে গেছে ঋণের বোঝাও।

আরেকটি ঘটনা দেখায়, প্রতারণা শুরু হতে পারে বাংলাদেশ ছাড়ার আগেই। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের শাহাপুর গ্রামের আসিফ খানকে মরক্কোতে কৃষিকাজের কথা বলে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয় বলে তার পরিবারের অভিযোগ। স্থানীয় দালাল জাকিরের সহায়তায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ২৮ মার্চ বিদ্যুতায়িত হয়ে তার মৃত্যু হয়। আসিফের পরিবার জানিয়েছে, বিদেশ পাঠাতে তাদের প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল।

একইভাবে কম্বোডিয়ায় গিয়ে আর ফেরেননি বগুড়ার ৫৩ বছর বয়সী জুয়েল হোসেন ও শাহনাজ তালুকদার। শাহনাজের পরিবারও বিদেশযাত্রার জন্য ঋণ করেছিল। তার স্ত্রী রেক্তা খাতুন জানিয়েছেন, পাঁচ মাস ও তিন বছর বয়সী দুই সন্তানকে রেখে স্বামী বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন আয় বন্ধ, অথচ ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায় রয়ে গেছে পরিবারের ওপর।

বৈধ পথেই গিয়ে কেন স্ক্যাম সেন্টারে?
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ১৬ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে দেশটিতে গিয়ে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ পরে সেখান থেকে উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরেছেন; তাদের অনেকের বর্ণনায় উঠে এসেছে নির্যাতন ও বন্দিদশার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে, যে কর্মীরা সরকারি প্রক্রিয়ায় ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের গন্তব্য কীভাবে বদলে যাচ্ছে? চাকরির নামে অন্য দেশে পাঠানো, কম্বোডিয়ায় পৌঁছে ভিন্ন কাজে নিয়োগ, কিংবা স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকে পড়ার মতো ঘটনা যদি ঘটে থাকে, তাহলে বিদেশ যাওয়ার আগের যাচাই-বাছাই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক কর্মকর্তা বলেন, এসব মৃত্যু শুধু চারটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এর সঙ্গে নিরাপদ অভিবাসন, কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা, মানবপাচার, সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।

চারজনের মরদেহ বৃহস্পতিবার দেশে ফিরবে। তাদের স্বজনদের কাছে বিদেশযাত্রার স্বপ্ন শেষ হয়েছে কফিনে। কিন্তু তাদের মৃত্যুর সঙ্গে যে প্রশ্নটি রয়ে যাচ্ছে, সেটি আরও বড়, সরকারি ছাড়পত্র যদি একজন কর্মীকে নিরাপদ কর্মস্থল পর্যন্ত পৌঁছানোর নিশ্চয়তা না দেয়, তাহলে বিদেশে যাওয়ার আগে একজন বাংলাদেশি কর্মীর প্রকৃত নিরাপত্তা যাচাই করবে কে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *