সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় শুধু বিচারপ্রক্রিয়া নয়, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে বাংলাদেশের দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মির্জা গালিব। তার প্রশ্ন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের কল্যাণে দূতাবাস কাজ করতে না পারলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন কী?
রোববার (১৮ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে, সেসব দেশে প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সেবা দেওয়া উচিত। প্রবাসীদের উপার্জনে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে, অথচ তাদের সুরক্ষা ও কল্যাণে যথাযথ ভূমিকা রাখবে না, এমন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মির্জা গালিব মূলত দুটি বিষয় সামনে এনেছেন। প্রথমটি হলো, অভিযুক্ত বাংলাদেশিরা ন্যায়বিচার পেয়েছিলেন কি না। দ্বিতীয়টি হলো, বিচার চলাকালে তাদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ দূতাবাস কী ভূমিকা পালন করেছে।
বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
ফেসবুক পোস্টে মির্জা গালিব বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অপরাধ করে থাকলে তাদের বিচার হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিচার কতটা স্বচ্ছ ছিল এবং তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
তার যুক্তি, বিদেশের মাটিতে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া একজন বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য ভাষা, স্থানীয় আইন ও বিচারিক পদ্ধতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যথাযথভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে পেরেছিলেন কি না, নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং তাদের পক্ষে কার্যকর আইনি সহায়তা ছিল কি না, সেসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
মির্জা গালিবের দাবি, বিচার চলাকালে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে কিছু জানায়নি। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক না হয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কোনো দেশের নাগরিক হলে তাদের বিচার ও শাস্তির ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি তৈরি হতো কি না।
তবে তার এই বক্তব্য মূলত বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন। প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ওই দুই বাংলাদেশির বিচার অন্যায্য ছিল বা তাদের আইনি অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
দূতাবাসের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
মির্জা গালিবের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বিদেশে বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় দূতাবাসের ভূমিকা। তার প্রশ্ন, সৌদি কর্তৃপক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য না দিলেও বাংলাদেশ দূতাবাস নিজ উদ্যোগে কিংবা প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মাধ্যমে ঘটনাটি জানতে পারত না কেন?
তিনি মনে করেন, প্রবাসীদের সঙ্গে দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে গুরুতর অপরাধের অভিযোগে আটক হলে তার আইনি সহায়তা, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে দূতাবাসের সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত।
পোস্টে তিনি লেখেন, প্রবাসী শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স আসে এবং এই অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে প্রবাসীদের উপার্জন থেকে রাষ্ট্র সুবিধা নিলেও তাদের কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।
তার বক্তব্যে দূতাবাসের কাছে শুধু কনস্যুলার সেবা দেওয়ার প্রত্যাশাই নয়, বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও উঠে এসেছে।
তবে এ ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাস কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, অভিযুক্তদের বিষয়ে দূতাবাস আগে থেকে কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না এবং তাদের আইনি সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তা জানতে দূতাবাসের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রয়োজন।
কী অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য জানায়। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তের পর তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয় এবং মামলাটি আদালতে পাঠানো হয়। সৌদি আরবের শরিয়াহ আইনের অধীনে ‘তাআজির’ বা বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তির বিধান অনুসারে আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন বলে জানানো হয়েছে।
মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করা এবং অপরাধ সংঘটনের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিচারক এ সাজা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে উচ্চতর বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখে। এরপর রাজকীয় আদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়।
রেমিট্যান্সের বাইরে প্রবাসীদের অধিকার কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিদেশে আটক বা বিচারাধীন বাংলাদেশিদের বিষয়ে দূতাবাস কত দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে, আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করে এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে ভূমিকা রাখে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মির্জা গালিবের বক্তব্য সেই জবাবদিহির প্রশ্নই সামনে এনেছে। তবে তার উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেতে হলে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির বিচারপ্রক্রিয়ার নথি, তাদের আইনি প্রতিনিধিত্বের তথ্য এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে দূতাবাসের নিষ্ক্রিয়তা বা বিচারপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কিন্তু ঘটনাটি ঘিরে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকেরা গুরুতর আইনি সংকটে পড়লে তাদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন?








