মালয়েশিয়ায় কাজ করতে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে চাকরির সুযোগ খোঁজা, নিয়োগকর্তার চাহিদাপত্র অনুযায়ী কর্মী নির্বাচন, ভিসার আনুষ্ঠানিকতা এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি ) ছাড়পত্র নেওয়ার মতো কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার নির্বাচন এবং অভিবাসন ব্যয় সম্পর্কে সতর্ক থাকাও জরুরি।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর নতুন কাঠামোয় মোট ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষ সম্মত হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি।
তবে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এক নয়। তাই মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহীদের প্রথমেই জানতে হবে, কোন প্রতিষ্ঠান কী ধরনের কাজ করার অনুমতি পেয়েছে এবং নিয়োগের কোন ধাপটি কীভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
প্রথমেই যাচাই করুন রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা
মালয়েশিয়ায় চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হলো বৈধ ও অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করা। শুধু কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর এজেন্সি দাবি করলেই তার মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা উচিত নয়।
এজেন্সি নির্বাচনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রিক্রুটিং লাইসেন্স, অনুমোদনের অবস্থা এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কাজ করার যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। এ জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করা প্রয়োজন।
নতুন কাঠামোয় বোয়েসেল, প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং রিক্রুটিং এজেন্সির দায়িত্ব পৃথক। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলেই সেটি সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
করণীয়: এজেন্সির নাম ও লাইসেন্স নম্বর যাচাই করুন। অনুমোদনের প্রমাণ এবং নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র না দেখে টাকা দেওয়া বা পাসপোর্ট জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
চাকরির চাহিদাপত্র বা জব অর্ডার সম্পর্কে নিশ্চিত হন
নতুন নিয়োগব্যবস্থায় তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা খুঁজে চাকরির চাহিদাপত্র বা জব অর্ডার সংগ্রহ করতে পারবে। এই চাহিদাপত্রের ভিত্তিতেই কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
তাই কোনো এজেন্সি মালয়েশিয়ায় চাকরির প্রস্তাব দিলে প্রথমেই জানতে হবে, নিয়োগকর্তা কে, কী ধরনের কাজ করতে হবে এবং নিয়োগের শর্ত কী।
চাকরির ধরন, বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা এবং চুক্তির মেয়াদ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে। সম্ভব হলে নিয়োগকর্তার দেওয়া লিখিত চাকরির প্রস্তাব ও চুক্তিপত্র সংগ্রহ করতে হবে।
কেবল মৌখিক আশ্বাসের ভিত্তিতে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে, ভুয়া জব অর্ডার দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কর্মী নির্বাচনের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন
নিয়োগকর্তার চাহিদা অনুযায়ী কর্মী নির্বাচন করা হবে। এ ক্ষেত্রে চাকরির ধরন অনুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হতে পারে।
কর্মীদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত নথি প্রস্তুত রাখতে হবে। নিয়োগকর্তা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কোনো কাগজপত্র চাইলে তা যাচাই করে সরবরাহ করতে হবে।
এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করার আগে জেনে নিন, কোন কোন নথি প্রয়োজন এবং সেগুলো জমা দেওয়ার নিয়ম কী। মূল কাগজপত্র জমা দিলে যথাযথ রসিদ বা প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
মালয়েশিয়ায় কাজ করতে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে এ জন্য কোন মেডিকেল সেন্টার অনুমোদিত, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বিতর্কিত ও অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট কেন্দ্রের মাধ্যমে কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নীতিমালার আলোকে মেডিকেল সেন্টারগুলো যাচাই-বাছাই করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দলের পরিদর্শনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কেন্দ্র অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট ও বাংলাদেশের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তালিকা প্রকাশ করার কথা জানানো হয়েছে।
কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগে সর্বশেষ অনুমোদিত তালিকা যাচাই করা। কোনো এজেন্সি বা মধ্যস্থতাকারীর কথায় অনুমোদনহীন কেন্দ্রে পরীক্ষা করানো উচিত নয়।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি কত, কী কী পরীক্ষা করতে হবে এবং রিপোর্ট পাওয়ার সময়সীমা কত—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র থেকে আগেই জেনে নিতে হবে।
কলিং ভিসা ও ই-ভিসা প্রক্রিয়া বুঝে নিন
কর্মী নির্বাচন ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ভিসা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
নতুন কাঠামোয়কলিং ভিসা, ই-ভিসা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে বোয়েসেলসহ নির্ধারিত প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সিগুলো সহায়তা করবে বলে জানানো হয়েছে।
তবে ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন জমা দেওয়ার পদ্ধতি এবং অনুমোদনের শর্ত সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকলেই বিদেশে কাজ করার চূড়ান্ত অনুমতি পাওয়া গেছে, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
ভিসা ও নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে নিজের নাম, পাসপোর্ট নম্বর, নিয়োগকর্তার তথ্য এবং চাকরির শর্ত সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করুন। কোনো তথ্য ভুল থাকলে যাত্রার আগে সংশোধনের উদ্যোগ নিন।
বিএমইটি ছাড়পত্র ছাড়া যাত্রার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করবেন না
মালয়েশিয়ার প্রয়োজনীয় প্রসেসিং সম্পন্ন হওয়ার পর বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই ছাড়পত্র গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজস্ব লাইসেন্সের অধীনে তাদের নির্বাচিত কর্মীদের বিএমইটি ছাড়পত্রের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবে। প্রয়োজনে নির্ধারিত প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সিগুলো প্রশাসনিক সহায়তা এবং অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেওয়ার কাজে যুক্ত থাকবে।
কর্মীদের নিশ্চিত হতে হবে, তাদের নিয়োগসংক্রান্ত নথি ও প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে কি না। শুধু ভিসা হাতে পাওয়া বা বিমানের টিকিট কেনাকেই পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
অভিবাসন ব্যয় সম্পর্কে সতর্ক থাকুন
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে ঘোষণাগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়া নীতিগত সম্মতি দিয়েছে।
তবে এই উদ্যোগের চূড়ান্ত বাস্তবায়নপদ্ধতি, কর্মী নির্বাচনের শর্ত এবং কোন কোন ব্যয় এর আওতায় থাকবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত নির্দেশনার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
তাই জিরো-কস্ট কর্মসূচির আওতায় যাওয়ার সুযোগ পাওয়া গেছে, কেউ এমন দাবি করলে আগে সরকারি তথ্য যাচাই করুন। নীতিগত সম্মতিকে সব কর্মীর জন্য সব ধরনের খরচ মওকুফের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সাধারণ নিয়োগপ্রক্রিয়ায়ও কর্মীদের কাছ থেকে কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তার লিখিত হিসাব ও রসিদ সংগ্রহ করা উচিত। ঋণ করে টাকা দেওয়ার আগে চাকরির সত্যতা, নিয়োগকর্তা এবং এজেন্সির বৈধতা যাচাই করা বিশেষভাবে জরুরি।
চুক্তিপত্র না পড়ে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না
বিদেশে যাওয়ার আগে নিয়োগকর্তার সঙ্গে চাকরির চুক্তিপত্র ভালোভাবে পড়ে নেওয়া প্রয়োজন। বেতন, কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, আবাসন, চিকিৎসা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে চুক্তিতে কী বলা আছে, তা বুঝে নিন।
এজেন্সি যে শর্ত জানিয়েছে, লিখিত চুক্তিতে তার সঙ্গে অমিল থাকলে বিষয়টি পরিষ্কার না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর বা অভিবাসন বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহায়তা নিন।
নিজের পাসপোর্ট, ভিসা, চুক্তিপত্র, অর্থ জমার রসিদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথির কপি নিরাপদে সংরক্ষণ করুন। পরিবারের কাছেও প্রয়োজনীয় নথির কপি রেখে যেতে পারেন।
সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করুন
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন নিয়োগব্যবস্থা চালুর ঘোষণা এলেও সব ধাপের চূড়ান্ত নির্দেশনা ও হালনাগাদ তালিকা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি, মেডিকেল সেন্টার, নিয়োগের নিয়ম এবং জিরো-কস্ট কর্মসূচির শর্ত সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
এ জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি , বোয়েসেল এবং মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করুন।
কোনো তথ্য অস্পষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া ভালো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিজ্ঞাপন বা মধ্যস্থতাকারীর প্রতিশ্রুতিকে সরকারি অনুমোদনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
কর্মীদের জন্য মূল কথা
মালয়েশিয়ায় কাজ করতে যেতে আগ্রহীদের জন্য নতুন নিয়োগব্যবস্থায় সুযোগ তৈরির পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি, বৈধ এজেন্সি নির্বাচন, সত্যিকারের জব অর্ডার যাচাই, অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসার শর্ত পূরণ এবং বিএমইটি ছাড়পত্র সংগ্রহ।
একই সঙ্গে নিয়োগের খরচ, চাকরির চুক্তি ও জিরো-কস্ট সুবিধার বিষয়ে লিখিত তথ্য নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিদেশে চাকরির সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি নিরাপদে যাত্রা, ন্যায্য শর্তে কাজ এবং আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশের আগে জরুরি যাচাই: অনুমোদিত এজেন্সি ও মেডিকেল সেন্টারের সর্বশেষ তালিকা, জিরো-কস্ট কর্মসূচির চূড়ান্ত শর্ত এবং আবেদন শুরুর নির্দিষ্ট পদ্ধতি সরকারি সূত্র থেকে নিশ্চিত করে প্রকাশ করা উচিত।








