রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

লিবিয়া হয়ে বাংলাদেশিদের ইউরোপযাত্রা ঠেকাতে ঢাকার সহযোগিতা চায় গ্রিস

লিবিয়া ও মিসর হয়ে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা বন্ধে ঢাকার সহযোগিতা চাইছে এথেন্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অভিবাসীদের যাত্রাপথ শনাক্ত, পরিচয় যাচাই এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থায় সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে।

ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের উত্তর আফ্রিকামুখী যাত্রা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সহযোগিতা চাইছে গ্রিস ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। শুধু ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে প্রবেশ ঠেকানো নয়, উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে মিসর ও লিবিয়াগামী ফ্লাইট ব্যবহার করে অভিবাসীদের যাতায়াতের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ।

গ্রিক সংবাদমাধ্যম কাথিমেরিনির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিবিয়া ও মিসর হয়ে গ্রিসে অনিয়মিত অভিবাসন কমাতে ঢাকা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করতে চায় এথেন্স।

এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গ্রিসের মনোযোগ শুধু সমুদ্রসীমায় আটকে নেই; বরং অভিবাসীরা কোন পথে উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছাচ্ছেন, সেই যাত্রাপথ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

ক্রিটে অভিবাসীদের আগমন বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে এক হাজারের বেশি অভিবাসী পৌঁছেছেন। তাদের অনেকে দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের ইয়ারাপেত্রা এলাকায় অবতরণ করেন। উত্তর আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ক্রিটে পৌঁছানোর এই প্রবণতা গ্রিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কাথিমেরিনির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত গ্রিসে অভিবাসীদের মোট আগমন প্রায় ৬২ হাজার থেকে কমে ৪২ হাজারে নেমেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক আগমনের সংখ্যা কমলেও নির্দিষ্ট কিছু সমুদ্রপথ দিয়ে প্রবেশের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।

বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ক্রিটে পৌঁছানোর পথটি গ্রিসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে লিবিয়ায় পাঁচ লাখের বেশি শরণার্থী ও অভিবাসী অবস্থান করছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে শুধু গ্রিসের উপকূলে নজরদারি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান করা কঠিন বলে মনে করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। অভিবাসীদের যাত্রা শুরুর আগের ধাপগুলোতে সহযোগিতা পাওয়াও তাদের পরিকল্পনার অংশ।

উপসাগরীয় দেশ থেকে লিবিয়ায় যাওয়ার পথেও নজর
বাংলাদেশিদের উত্তর আফ্রিকামুখী যাত্রা নিয়ন্ত্রণে গ্রিস ও ইইউর উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিমানপথের ব্যবহার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে মিসরের রাজধানী কায়রো এবং লিবিয়ার বেনগাজি ও ত্রিপোলিগামী ফ্লাইটের মাধ্যমে যাতায়াতের বিষয়টি গ্রিক কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে।

তাদের বিবেচনায়, কিছু বাংলাদেশি নাগরিক আকাশপথে লিবিয়ায় পৌঁছে সেখান থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ কারণে অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে শুধু ভূমধ্যসাগরের রুট নয়, উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছানোর আগের যাত্রাপথ নিয়েও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে এসব ফ্লাইটে যাতায়াতকারী বাংলাদেশিদের কতজন পরে সমুদ্রপথে গ্রিসে প্রবেশের চেষ্টা করেন, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি। ফলে বিমানপথে যাতায়াতের এই উদ্বেগের প্রকৃত পরিধি নির্ধারণে আরও তথ্য প্রয়োজন।

পরিচয় শনাক্ত ও ফেরত পাঠাতে সমন্বয়ের উদ্যোগ
অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিবাসীদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। কাথিমেরিনির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় চলছে। ফেরত পাঠানোর জন্য চার্টার ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

এ ধরনের ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। তবে কতজন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে, চার্টার ফ্লাইট কবে পরিচালিত হতে পারে কিংবা এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে কি না, প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট করা হয়নি।

ফলে সহযোগিতার উদ্যোগ চললেও এর বাস্তবায়ন ও সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

আশ্রয়প্রক্রিয়া স্থগিতের সম্ভাবনা
প্রতিবেদনে আশ্রয়প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার সম্ভাব্য ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা কোন পরিস্থিতিতে কার্যকর হবে, কত দিন বহাল থাকতে পারে কিংবা কোন শ্রেণির অভিবাসীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, অনিয়মিতভাবে কোনো দেশে প্রবেশের চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বা আশ্রয় পাওয়ার যোগ্যতা এক বিষয় নয়। তাই সম্ভাব্য কোনো স্থগিতাদেশের কথা উল্লেখ থাকলেও তার আইনি ভিত্তি, পরিধি ও বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া এর প্রভাব নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

সংঘাতপীড়িত মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশিদের যাত্রাপথের পার্থক্য
উত্তর আফ্রিকা হয়ে গ্রিসে পৌঁছানো অভিবাসীদের সবাই একই পরিস্থিতিতে যাত্রা করেন না। কাথিমেরিনির প্রতিবেদনে সুদানের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা নাগরিকদের মতো সংঘাতপীড়িত মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের যাত্রাপথের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।

গ্রিক কর্তৃপক্ষের বিবেচনায়, কিছু বাংলাদেশি আকাশপথে লিবিয়ায় গিয়ে পরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা মানুষের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে কোনো ব্যক্তির জাতীয়তা বা যাত্রাপথের ভিত্তিতে তার আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ধরনের মূল্যায়নে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনি শর্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ঢাকার জন্য সামনে কী প্রশ্ন
বাংলাদেশের সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় প্রত্যাবাসন, নাগরিকদের পরিচয় যাচাই এবং বিদেশে বাংলাদেশিদের সুরক্ষা নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রিস ও ইইউর সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কী ধরনের সহযোগিতা দেবে, এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে কি না এবং প্রস্তাবিত পদক্ষেপের আওতা কতটুকু তা এখনো স্পষ্ট নয়।

একই সঙ্গে অনিয়মিত অভিবাসন কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বৈধভাবে বিদেশে যাতায়াতকারী বাংলাদেশিদের ওপর কোনো অতিরিক্ত বিধিনিষেধ বা যাচাইপ্রক্রিয়ার প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও নজরে রাখা প্রয়োজন।

কাথিমেরিনির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিস ও ইইউ বাংলাদেশ, উপসাগরীয় দেশ এবং উত্তর আফ্রিকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায়। তবে এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমন্বয়, গৃহীত ব্যবস্থার বাস্তবায়ন এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রযোজ্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *