রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

লাগেজ চুরি-ক্ষতি ঠেকাতে শাহজালালে নজরদারি, আট বেল্টে ৩২ ক্যামেরা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো, চুরি ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ মোকাবিলায় নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় বসানো হয়েছে ৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা। যাত্রীদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটর। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, পরিবহন ও বাছাইয়ের পর বেল্টে পৌঁছানোর দৃশ্য সরাসরি দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বেবিচকের এ উদ্যোগের লক্ষ্য লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো। তবে ক্যামেরা ও মনিটর স্থাপনের পাশাপাশি লাগেজ চুরি, কাটা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা বাস্তবে কতটা কমে, তা নির্ভর করবে নজরদারির কার্যকারিতা, ফুটেজ সংরক্ষণ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।

বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। যাত্রীরা মনিটরে তাদের লাগেজের অবস্থান দেখতে পারবেন এবং ব্যবস্থাপনার কোনো ধাপে সমস্যা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও ধারণা পাবেন।

আটটি বেল্টে ৩২ ক্যামেরা, মনিটর ১৮টি
বেবিচক জানিয়েছে, প্রতিটি লাগেজ বেল্টের ব্যাগেজ এলাকায় চারটি করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আটটি বেল্টে সব মিলিয়ে ক্যামেরার সংখ্যা ৩২। এ ছাড়া ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটরের মাধ্যমে লাগেজ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ সরাসরি দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ ব্যবস্থায় উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং আগমন এলাকার বেল্টে পৌঁছানোর দৃশ্য দেখা যাবে। ফলে লাগেজ ব্যবস্থাপনার কোন পর্যায়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা শনাক্ত করার সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানোই লাগেজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র শর্ত নয়। কোন কোন এলাকা ক্যামেরার আওতায় এসেছে, ফুটেজ কত দিন সংরক্ষণ করা হবে এবং কোনো অনিয়ম শনাক্ত হলে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

হাইকোর্টের নির্দেশনার পর তদন্ত কমিটি
শাহজালালে লাগেজ হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কাটা ও চুরির ঘটনা প্রতিরোধে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া নির্দেশনার পর উচ্চপর্যায়ের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। গত ১০ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের আইন-১ শাখা থেকে এ বিষয়ে অফিস আদেশ জারি করা হয়।

ছয় সদস্যের কমিটি তদন্ত ও মূল্যায়ন শেষে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একাধিক সুপারিশ দেয়।

কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারলাইন অপারেটরস কমিটির (এওসি) চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাহক সেবা ও কার্গো বিভাগের পরিচালক এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের পরিচালক।

শুধু সিসিটিভি নয়, কর্মীদের শরীরেও ক্যামেরার সুপারিশ
তদন্ত কমিটির ছয় দফা সুপারিশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে আগমন এলাকার বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা। বর্তমান উদ্যোগে ক্যামেরা ও মনিটর স্থাপনের মাধ্যমে এ সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

তবে কমিটির সুপারিশ শুধু সিসিটিভি স্থাপনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্যামেরার আওতাবহির্ভূত এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি বাড়ানো এবং লাগেজ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মীদের শরীরে ধারণযোগ্য ক্যামেরা চালুর কথাও বলা হয়েছিল।

এ ছাড়া সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং আকস্মিক পরিদর্শনের সুপারিশ করে কমিটি। লাগেজ চুরি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এসব সুপারিশের কার্যকর বাস্তবায়ন হলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম শনাক্ত করা এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হতে পারে। তবে শরীরে ধারণযোগ্য ক্যামেরা চালু হয়েছে কি না এবং ফুটেজ সংরক্ষণ ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে বেবিচকের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাগ কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগাম সতর্কবার্তা
তদন্ত কমিটি লাগেজের ক্ষতি শনাক্ত ও যাত্রীকে আগেই সতর্ক করার বিষয়েও সুপারিশ করেছে। কোনো ব্যাগ যাত্রার মূল বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে কাটা, খোলা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই আগাম সতর্কবার্তা ও ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাগের ছবি পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাগে পরিচিতিমূলক স্টিকার লাগানোর সুপারিশ করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, যাত্রী লাগেজ হাতে পাওয়ার আগেই ক্ষতির বিষয়ে জানতে পারবেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

কমিটি প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপদ লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও মানসম্মত পরিচালন পদ্ধতি বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে।

যাত্রীদের সচেতনতা ও তথ্য ব্যবস্থাপনাতেও জোর
লাগেজ নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যাত্রীদের সচেতনতার বিষয়টিও তদন্ত কমিটির সুপারিশে উঠে এসেছে। মূল্যবান সামগ্রী লাগেজে না রাখার বিষয়ে যাত্রীদের সচেতন করতে প্রচারণা চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি সঠিক তথ্য প্রচারের জন্য নিজস্ব জনসংযোগ দল বা গণমাধ্যম সেল গঠনের সুপারিশ করা হয়। প্রমাণ বা যাচাই ছাড়া নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এ ক্ষেত্রে যাচাই করা অভিযোগ, প্রকৃত ক্ষতির ঘটনা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্তের ফল জানানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া কার্যকর না হলে শুধু প্রচারণার মাধ্যমে আস্থা তৈরি করা কঠিন।

নজরদারি বাড়ল, কার্যকারিতা যাচাইয়ের অপেক্ষা
বেবিচক জানিয়েছে, যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ও যাত্রীবান্ধব সেবা সম্প্রসারণের কাজ চলছে।

৩২টি ক্যামেরা ও ১৮টি বড় মনিটর স্থাপনের মাধ্যমে লাগেজ ব্যবস্থাপনার দৃশ্যমানতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে লাগেজ হারানো, চুরি ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ কমছে কি না, অনিয়মের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না এবং যাত্রীরা অভিযোগের প্রতিকার পাচ্ছেন কি না, তার ওপর।

এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, তদন্ত কমিটির বাকি সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন কতদূর এগিয়েছে এবং নতুন নজরদারি ব্যবস্থার ফলে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, সে বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা। তবেই প্রযুক্তি স্থাপনের উদ্যোগকে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *