রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সবশেষ

সৌদি ফ্লাইট বন্ধের প্রভাব শাহজালালে, যাত্রী-স্বজনহীন বিমানবন্দরে নীরবতা

রোববার দুপুর ১২টা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমনী ও বহির্গমনী টার্মিনালে নেই চেনা ভিড়। যাত্রীদের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের ভিড় নেই, নেই গাড়ির দীর্ঘ সারি। বিমানবন্দরের সামনের পার্কিং এলাকাও প্রায় ফাঁকা। যে টার্মিনালে একসঙ্গে একাধিক ফ্লাইট অবতরণের সময় মানুষের ভিড়ে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ত, সেখানে এখন অনেকটাই নীরব পরিবেশ।

সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে ঢাকার এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় দেশটিতে যেতে পারছেন না অনেক যাত্রী। একই সঙ্গে সেখান থেকে দেশে ফিরতে না পারায় কমেছে প্রবাসীদের আগমনও। ফলে যাত্রীদের নিতে আসা স্বজন ও তাদের বহনকারী গাড়ির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

রোববার সরেজমিনে বিমানবন্দরের দুই টার্মিনাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। যাত্রী কমে যাওয়ায় কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের কাজের চাপও আগের তুলনায় কম। তবে বিমানবন্দরের এই আপাত স্বস্তির পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন এবং প্রবাসীদের যাতায়াতে অনিশ্চয়তা।

আগমনী টার্মিনালে নেই স্বজনদের ভিড়
শাহজালালের আগমনী টার্মিনালে সাধারণত কোনো ফ্লাইট অবতরণের পর যাত্রীদের নিতে আসা স্বজনদের ভিড় বাড়তে থাকে। অনেক সময় একাধিক ফ্লাইট কাছাকাছি সময়ে অবতরণ করলে টার্মিনালের সামনে মানুষের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। যাত্রীদের নিতে আসা গাড়ির ভিড়ে পার্কিংয়েও জায়গা পাওয়া যায় না। তখন অনেককে নির্ধারিত স্থানের বাইরে গাড়ি রাখতে হয়।

কিন্তু রোববারের চিত্র ছিল ভিন্ন। আগমনী দুই টার্মিনালের সামনে আগের মতো মানুষের জটলা দেখা যায়নি। যাত্রীদের লাগেজ নিয়ে বের হওয়ার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের তাড়াহুড়োও ছিল না। ট্রলি সংগ্রহ কিংবা একসঙ্গে একাধিক ফ্লাইটের যাত্রী সামলানোর চেনা ব্যস্ততা অনেকটাই অনুপস্থিত।

আগে একজন প্রবাসী দেশে ফিরলে তাকে নিতে অনেক সময় পরিবারের একাধিক সদস্য বিমানবন্দরে আসতেন। ফলে একজন যাত্রীর সঙ্গে সাত-আটজন পর্যন্ত স্বজনের উপস্থিতি দেখা যেত। তাদের বহনকারী গাড়িও পার্কিং এলাকায় বাড়তি চাপ তৈরি করত। এখন প্রবাসীদের আগমন কমে যাওয়ায় সেই ভিড়ও কমেছে।

দুবাই থেকে আসা যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা হাবিবুর রহমান বলেন, তিনি তার ভাইকে নিতে বিমানবন্দরে এসেছেন। এর আগেও কয়েকবার বিমানবন্দরে এসেছেন তিনি। কিন্তু এবারকার মতো ফাঁকা পরিস্থিতি আগে দেখেননি।

বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনে দায়িত্ব পালন করা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য ইশতিয়াক আহমেদও যাত্রী কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যাত্রী না থাকায় বিমানবন্দর অনেকটাই ফাঁকা। আগে যাত্রী ও তাদের স্বজনদের সামলাতে যে চাপ ছিল, এখন তা নেই। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আবারও চাপ বাড়তে পারে।

বহির্গমনেও কমেছে যাত্রীর চাপ
শুধু দেশে ফেরা যাত্রীদের ক্ষেত্রেই নয়, বিদেশগামীদের টার্মিনালেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সৌদি আরবগামী একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের উপস্থিতি কমেছে। ওমরাহ পালনে যাওয়া কিছু যাত্রীকে দেখা গেলেও আগের মতো যাত্রীর ঢল ছিল না।

কাতারের রাজধানী দোহাগামী যাত্রী আকবর হোসেন বলেন, দুই মাস আগে বিমানবন্দরে আসার সময় ক্যানোপি এলাকায় যে ভিড় দেখেছিলেন, এবার সেই চিত্র পাননি। টার্মিনালের ওপর-নিচ কোথাও যাত্রীদের তেমন চাপ চোখে পড়েনি।

দোহাগামী আরেক যাত্রী তরিকুল ইসলাম মনে করেন, সৌদি আরবের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিমানবন্দরের এই চিত্র অব্যাহত থাকতে পারে।

তাদের বক্তব্যে বিদেশযাত্রার স্বাভাবিক ব্যস্ততা কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে সৌদি আরবগামী ফ্লাইটের পাশাপাশি অন্যান্য রুটে যাত্রী চলাচলের প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে সংশ্লিষ্ট রুটের ফ্লাইট ও যাত্রীসংখ্যার পরিসংখ্যান প্রয়োজন।

কাজের চাপ কমেছে, বদলেছে কর্মীদের দৈনন্দিন ব্যস্ততাও
যাত্রী কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের কাজেও। কাস্টমস, ইমিগ্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের এখন আগের তুলনায় কম যাত্রী সামলাতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমসের এক কর্মকর্তা বলেন, আগে কাজের চাপে খাওয়া, ওয়াশরুমে যাওয়া কিংবা নামাজ পড়ার সময় বের করাও কঠিন হয়ে পড়ত। কিন্তু গত কয়েক দিনে যাত্রীর চাপ এতটাই কমেছে যে পরিস্থিতি তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের চাপ সামলাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন তারা। এখন কাজের সেই ব্যস্ততা না থাকায় কেমন যেন লাগছে।

তবে যাত্রী কম থাকায় কর্মীদের চাপ কমলেও এটিকে বিমানবন্দরের সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে যাত্রী, তাদের পরিবার, সংশ্লিষ্ট পরিবহনসেবা এবং বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসার ওপর কী প্রভাব পড়ে, বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি চিত্র তুলে ধরছে।

আট দিনে বাতিল ১১৪ ফ্লাইট, ভোগান্তিতে প্রবাসীরা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার পর ওই দুই বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট পরিচালনাতেও।

গত আট দিনে ১১৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে ১৭ হাজারের বেশি প্রবাসী আটকা পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব থেকেও হাজার হাজার প্রবাসী দেশে ফিরতে পারছেন না।

ফ্লাইট বাতিলের কারণে একদিকে বিদেশগামী যাত্রীরা নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে যেতে পারছেন না, অন্যদিকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরাও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে তাদের নিতে আসা স্বজনদের যাতায়াত এবং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যেও।

শাহজালালের ফাঁকা টার্মিনাল ও গাড়িশূন্য পার্কিং তাই শুধু যাত্রী কমে যাওয়ার দৃশ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্নের কারণে প্রবাসীদের আটকে পড়া এবং পরিবারের সঙ্গে তাদের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার বাস্তবতা।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছানো হবে এবং সৌদি আরবে আটকে থাকা প্রবাসীদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা কত দ্রুত নিশ্চিত করা যাবে, এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর ও বিমান সংস্থাগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *