বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নির্যাতন, অধিকার লঙ্ঘন ও বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা জোরদারের দাবি উঠেছে। প্রবাসী বাংলাদেশি অধিকার সংস্থা ‘প্রবাস’ বলছে, বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানো, নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব দাবিতে রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন ‘প্রবাস’-এর সদস্যরা। কর্মসূচি শেষে তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি জমা দেন। এতে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার পাশাপাশি নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত, আইনি সহায়তা এবং বিপদগ্রস্ত নাগরিকদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সৌদি আরব থেকে নারী কর্মীদের ফেরার তথ্য তুলে ধরে ক্ষতিপূরণের দাবি
মানববন্ধনে সংগঠনটির সদস্যসচিব ও অ্যাক্টিভিস্ট আনন্দ কুটুম সৌদি আরব থেকে নারী কর্মীদের দেশে ফেরার বিষয়টি তুলে ধরেন। তার দাবি, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গত নয় মাসে ৯৮০ জন নারী কর্মী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ফিরেছেন বলেও জানান তিনি।
আনন্দ কুটুম এসব নারীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা এবং তাদের সন্তানদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনা ও উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তবে তার বক্তব্যে উল্লেখ করা ৯৮০ জন নারী কর্মীর তথ্যের উৎস, তাদের ফেরার পরিস্থিতি এবং নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান কর্মসূচিতে তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি ও প্রতিকারের অগ্রগতি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
বিচারাধীন প্রবাসীদের ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ
সংগঠনটির আহ্বায়ক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা মনন বলেন, বিদেশে বিচারাধীন অবস্থায় থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকেরা যেন ন্যায়বিচার পান, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে বিদেশে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
তাদের বক্তব্যে বিদেশে বিচারাধীন নাগরিকদের আইনি সহায়তা, মামলার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়গুলো সামনে আসে।
দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
চিকিৎসক ও সংগঠনটির সমন্বয়ক তৃণা ইসলাম বলেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষায় দূতাবাসগুলো যথাযথ ভূমিকা পালন করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সাংবাদিক ও সংগঠনটির গণমাধ্যম সমন্বয়ক হাসনাত কাদীর বলেন, প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বক্তারা বলেন, বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিপদে পড়লে তাকে প্রয়োজনীয় আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা দিতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও কূটনৈতিক উদ্যোগও নিতে হবে।
স্মারকলিপি যাবে আরও দুই দপ্তরে
প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা, আইনি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত ‘প্রবাস’ জানিয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও স্মারকলিপি দেওয়া হবে।
‘বিদেশে শ্রমিকের নিরাপত্তা চাই’ ও ‘নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ডের জবাব চাই’ স্লোগানে আয়োজিত কর্মসূচিটির সহ-আয়োজক ছিল দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক গণতন্ত্র ও জবাবদিহিবিষয়ক নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ান অ্যাকাউন্টেবিলিটি নেটওয়ার্ক ফর ডেমোক্রেসি (স্যান্ড)। এতে গবেষণা সহযোগী হিসেবে ছিল চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য স্কলারো’।
দাবির পর বাস্তবায়নই বড় প্রশ্ন
স্মারকলিপিতে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রবাসীদের নিরাপত্তা জোরদার, নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত, বিচারাধীন শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নারী কর্মীদের ক্ষতিপূরণ ও তাদের সন্তানদের স্বীকৃতির ব্যবস্থা। এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষায় দূতাবাসগুলোর ভূমিকা, আইনি সহায়তার কার্যকারিতা এবং নির্যাতনের অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া কতটা ফলপ্রসূ, সে বিষয়েও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বক্তারা। তবে স্মারকলিপির বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বা পরবর্তী পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি।








