দুবাইয়ে প্রবাসী বাংলাদেশির দোকান থেকে ৯৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা চুরির মামলার তদন্তে উঠে এসেছে কক্সবাজারের রামুর রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলমের নাম। চুরি হওয়া অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় এক আসামির স্বীকারোক্তিতে তার নাম আসার পর তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, আত্মসাৎ করা অর্থের মধ্যে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন চেয়ারম্যান। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রামুর জেঠিরাস্তা এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে পুলিশের যৌথ অভিযানে শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চুরি হওয়া অর্থের লেনদেন ও বণ্টনের সূত্র ধরে তদন্তে চেয়ারম্যানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়।
স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে চেয়ারম্যানের নাম
মামলার তদন্তে পুলিশের নজরে আসে উম্মে কুলছুম নামের এক আসামির বক্তব্য। মামলার তিন নম্বর আসামি উম্মে কুলছুমের স্বীকারোক্তিতে রশিদনগর ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলমের নাম উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বীকারোক্তিতে উম্মে কুলছুম দাবি করেন, চুরি হওয়া অর্থ থেকে শাহ আলম ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এই বক্তব্যের ভিত্তিতে চেয়ারম্যানের সংশ্লিষ্টতা তদন্ত করা হয় এবং পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে স্বীকারোক্তিতে কারও নাম আসা বা অভিযোগ ওঠা নিজেই অপরাধ প্রমাণের চূড়ান্ত ভিত্তি নয়। অর্থের লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের বিষয়।
দোকানের কর্মচারীকে ঘিরে মামলার সূত্রপাত
মামলার এজাহার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুবাইয়ে নিজের বোরকার দোকান থেকে টাকা চুরির অভিযোগে প্রবাসী সাইফুল ইসলাম গত ১ অক্টোবর চকরিয়া থানায় মামলা করেন। তিনি কক্সবাজারের ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়া সিকদারপাড়ার বাসিন্দা।
মামলায় দোকানের কর্মচারী মো. নোমানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মিলি আক্তার, উম্মে কুলছুম, রমিজুর রহমান তুহিন, মীর আহমদ ও জাহানারা আরজু। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, দোকান থেকে মোট ৯৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা চুরি হয়েছে। তদন্তে পুলিশ শুধু কথিত চুরির ঘটনাই নয়, চুরি হওয়া অর্থ কোথায় গেছে এবং কারা তা পেয়েছেন, সেই বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখছে।
বালিশের নিচে চাবি রেখে জিমে যান সাইফুল
এজাহারে সাইফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, দুবাইয়ে তার বোরকার ব্যবসা ছিল। নোমান তার দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। পরিচিত হওয়ায় নোমানকে বিশ্বাস করতেন তিনি। এমনকি দুবাইয়ে তারা একই কক্ষেও থাকতেন।
সাইফুলের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানের প্রতিদিনের বিক্রির টাকা তিনি শয়নকক্ষের একটি তালাবদ্ধ ক্যাশ ড্রয়ারে রাখতেন। কয়েক দিন পর সেখান থেকে টাকা নিয়ে দোকানের মালামাল কিনতেন অথবা ব্যাংকে জমা দিতেন। ড্রয়ারের চাবি সাধারণত নিজের কাছেই রাখতেন।
এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টার দিকে শরীরচর্চার জন্য জিমে যাওয়ার সময় ভুল করে ড্রয়ারের চাবি বিছানার বালিশের নিচে রেখে যান সাইফুল। ওই সময় নোমান কক্ষে ছিলেন।
সকাল ১০টার দিকে ফিরে তিনি দেখতে পান, শয়নকক্ষের বিছানাপত্র, বালিশ ও কাপড়চোপড় এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে। নোমানকেও কক্ষে পাননি তিনি। এরপর ক্যাশ ড্রয়ার খুলে দেখেন, সেখানে রাখা দিরহাম নেই।
সাইফুল জানান, নোমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাননি। আশপাশে খোঁজাখুঁজি এবং পরিচিতজন ও প্রবাসীদের জানানো সত্ত্বেও তার সন্ধান মেলেনি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
উদ্ধার হয়েছে ২২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা
মামলার তদন্তে এর আগে অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ২২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে চুরি হওয়া মোট অর্থের তুলনায় উদ্ধার করা টাকার পরিমাণ কম। বাকি অর্থ কোথায় রয়েছে, কার কাছে কত টাকা গেছে এবং অর্থের লেনদেনে আর কারা জড়িত, এসব বিষয়ে তদন্তের বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
চকরিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) ইসমাইল বলেন, তদন্তে শাহ আলমের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে চলবে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম?
শাহ আলম গ্রেপ্তার হওয়ার পর রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়েও প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান জানান, তিনি রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে চেয়ারম্যানের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জেনেছেন। তার অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুবাইয়ের একটি দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির অভিযোগে শুরু হওয়া মামলাটি এখন অর্থের গতিপথ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণের পর্যায়ে রয়েছে। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা, আত্মসাৎ করা অর্থের সম্পূর্ণ হিসাব এবং ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতিতে স্পষ্ট হওয়ার কথা।








