ইতালিতে কাজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে দালালদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দেওয়ার দিন শেষ হতে পারে। দক্ষতা ও ভাষা প্রশিক্ষণ নিয়ে সম্পূর্ণ বিনা খরচে দেশটিতে যাওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই প্রক্রিয়ায় ইতালির প্রচলিত বার্ষিক কর্মী নিয়োগের কোটা বা ‘ডিক্রেটো ফ্লুসি’র অপেক্ষাও করতে হবে না। নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ শেষ করে বছরের যেকোনো সময় আবেদন করা যাবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে আয়োজিত এক সেমিনারে ইতালি দূতাবাসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ‘ইতালিতে দক্ষ অভিবাসনের জন্য ভাষা, নাগরিক এবং পেশাদার প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ইতালি এখন শুধু কর্মী নিয়োগ নয়, বরং প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি নিতে আগ্রহী। এ লক্ষ্যেই অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর ধারা বা আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে ইতালিতে প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজারের রয়েছে ওয়ার্ক পারমিট। দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তি সরবরাহকারী দেশ হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছে।
তিন বছরে প্রায় ৫ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে ইতালি
ইতালিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের অন্যতম প্রধান ব্যবস্থা হলো ‘ডিক্রেটো ফ্লুসি’। এটি মূলত দেশটির সরকারের নির্ধারিত বার্ষিক কর্মী নিয়োগ কোটা, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে কতজন বিদেশি কর্মী নেওয়া হবে, তা ঠিক করা হয়।
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইতালির।
বছরভিত্তিক নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা হলো:
২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন।
২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন।
২০২৮ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন।
এই কর্মী নিয়োগের কোটা বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভাগ করা হবে। অনিয়মিতভাবে ইতালিতে প্রবেশ করা অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দেশটির জন্য সংরক্ষিত কোটাও রয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
তবে প্রচলিত এই কোটা ব্যবস্থার বাইরেও বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে আর্টিকেল ২৩।
কীভাবে কোটা ছাড়াই ইতালি যাওয়া যাবে?
ইতালির অভিবাসন আইনের আর্টিকেল ২৩ অনুযায়ী, ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত কোনো প্রশিক্ষণ প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করলে বিদেশি কর্মীরা প্রচলিত ডিক্রেটো ফ্লুসির কোটা ছাড়াই দেশটিতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অবস্থান করেই নির্ধারিত প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে। প্রশিক্ষণ হতে হবে ইতালির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ও সার্টিফায়েড প্রকল্পের আওতায়।
এই প্রশিক্ষণে তিনটি বিষয় বাধ্যতামূলক:
১. ইতালিয়ান ভাষা: দেশটিতে দৈনন্দিন জীবনযাপন ও কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য প্রাথমিক ভাষাগত দক্ষতা অর্জন।
২. নাগরিক শিক্ষা: ইতালির সমাজ, সংস্কৃতি, নিয়মকানুন ও নাগরিক জীবন সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দেওয়া।
৩. পেশাগত দক্ষতা: যে খাতে কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, সেই কাজের ওপর প্রয়োজনীয় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ।
এই ব্যবস্থার অন্যতম সুবিধা হলো, আবেদন বা প্রশিক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ‘ক্লিক ডে’ নেই। অর্থাৎ প্রচলিত কোটা ব্যবস্থার মতো নির্দিষ্ট দিনে আবেদন করার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে না। প্রশিক্ষণ প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী বছরের বিভিন্ন সময় আবেদন করা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই প্রশিক্ষণের জন্য কর্মীকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না। দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ব্যয় কর্মীর ওপর চাপানো হবে না।
প্রশিক্ষণ শেষে কীভাবে মিলবে চাকরি ও ভিসা?
অনুষ্ঠানে ইতালি দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা হয়েছে। ইতালিতে চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘নুলা ওস্তা’ বা Nulla Osta পাওয়া মানেই দেশটিতে প্রবেশের চূড়ান্ত অনুমতি নয়।
এটি মূলত ইতালির কোনো নিয়োগকর্তার মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমোদন। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মীকে ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। ভিসা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইতালি দূতাবাস। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তার অনুমোদন এবং ভিসা, প্রতিটি ধাপ আলাদাভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
ইতালি পৌঁছে আট দিনের মধ্যে যে কাজ করতে হবে
ইতালিতে কর্মী হিসেবে পৌঁছানোর পরও রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতা। দেশটিতে প্রবেশের আট দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কুয়েস্তুরা বা পুলিশ হেডকোয়ার্টারে গিয়ে রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন করতে হবে।
কর্মচুক্তির শর্ত অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছরের জন্য রেসিডেন্স পারমিট দেওয়া হতে পারে। পরবর্তী সময়ে নিয়ম মেনে এটি নবায়ন করা যাবে। আর পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অনির্দিষ্টকালের রেসিডেন্স পারমিট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পাঁচ সুবিধায় এগিয়ে আর্টিকেল ২৩
অনুষ্ঠানে ‘ফরম্যাট’-এর প্রতিনিধি আন্তোনিও মিলো আর্টিকেল ২৩-এর পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধার কথা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমত, এটি প্রচলিত কর্মী নিয়োগ কোটার বাইরে একটি বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণের জন্য কর্মীকে কোনো অর্থ দিতে হয় না। তৃতীয়ত, ইতালি সরকার শুরু থেকেই পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করায় এটি তুলনামূলক নিরাপদ।
চতুর্থত, প্রশিক্ষণ নিয়ে ইতালিতে যাওয়ায় কর্মীরা ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পান। ফলে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পর মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়। পঞ্চমত, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কেউ ইতালি যেতে না পারলেও অর্জিত দক্ষতা বাংলাদেশে কাজে লাগাতে পারবেন।
দূতাবাস জানায়, ২০২৩ সালের ৭ জুলাই এই গাইডলাইন গ্রহণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশে বাস্তবায়িত প্রথম দিকের প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা এবং নতুন বিধির কার্যক্রম তুলে ধরতেই ঢাকায় এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
১৫০ ইউরোর ভিসার জন্য লাখ লাখ টাকা কেন?
ইতালিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে অনুষ্ঠানে।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতালির ভিসার সরকারি ফি ক্যাটাগরিভেদে ৫০ থেকে ১১৬ ইউরো। এর সঙ্গে ভিএফএসের ৩৮ ইউরো সার্ভিস চার্জ যুক্ত হলে মোট খরচ সর্বোচ্চ ১৫৪ ইউরো হতে পারে।
অথচ একই ভিসার আশ্বাস দিয়ে কিছু দালাল ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত দাবি করছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে এসব অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
আয়োজকদের বক্তব্য, বৈধ প্রক্রিয়ায় ভিসা পাওয়ার সরকারি খরচ তুলনামূলক কম। অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশই চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় প্রশিক্ষণের জন্যও কোনো খরচ নেই। তাই দালালের ওপর নির্ভর না করে ইতালি দূতাবাস এবং বিএমইটির প্রকাশিত বৈধ তথ্য অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দক্ষ কর্মী তৈরিতে বাংলাদেশেও চালু হতে পারে নতুন মডেল
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ইতালি যাওয়ার পর বাংলাদেশি কর্মীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করবে।
তিনি জানান, কর্মীদের হাতে প্রবাসী কার্ড তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি বোয়েসেলসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দক্ষ অভিবাসনের ক্ষেত্রেও সহায়তা করা হবে।
প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইতালিয়ান ভাষা শেখার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা অর্জনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিকে বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরির একটি মডেল হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, ইতালিতে যাওয়ার আগে পাঁচ থেকে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে যারা বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ইতালিয়ান ভাষায় দক্ষ হচ্ছেন, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কারিকুলাম দেশের টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার এবং ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চালুর চেষ্টা করা হবে।
হোটেল ও টেক্সটাইল খাতে চলছে প্রশিক্ষণ
সেমিনারে আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় পরিচালিত প্রশিক্ষণ প্রকল্পের অংশগ্রহণকারীরাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ফ্রন্টিয়ের স্কিলসের নির্বাচিত ‘টেস্ট’ প্রকল্পের সম্ভাব্য অভিবাসীরা। তারা রেস্টুরেন্ট ও হসপিটালিটি খাতে কাজের জন্য ঢাকা রিজেন্সি হোটেলেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
এ ছাড়া ‘ফরম্যাট’-এর অধীনে টেক্সটাইল খাতের একদল প্রশিক্ষণার্থীও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইতালি দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ফেদেরিকো জাম্পারেলি। সূচনা বক্তব্য রাখেন ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন বাইবা জারিনা। তিনি ইউরোপে নিরাপদ, বৈধ ও দক্ষ অভিবাসনের ক্ষেত্রে ট্যালেন্ট পার্টনারশিপের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইতালি দূতাবাসের মাইগ্রেশন অ্যাডভাইজার জিউসেপ্পে ডি জিওভান্নি। তিনি ইতালিতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রবেশের নিয়ম এবং আর্টিকেল ২৩-এর বিধান ব্যাখ্যা করেন।
এ ছাড়া প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন ফরম্যাটের মাসিমিলিয়ানো ডি ফুসকো, ফ্রন্টিয়ের স্কিলসের আন্তোনিও মিলো এবং ইউপি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির ম্যানেজার এন্নিও মিলানো। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হেড অব প্রোগ্রাম গুঞ্জন ডালাকোটি এবং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) চিফ অব মিশন ড. লরা নিকোল টম-বন্ডে।








