বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের শাস্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তে বিশ্ব ফুটবলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ফিফা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে এক ম্যাচের বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েই নয়, এর নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও চলছে ব্যাপক আলোচনা।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে রাউন্ড অব বত্রিশের ম্যাচে সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন বালোগান। সে অনুযায়ী পরবর্তী ম্যাচে তাঁর খেলার সুযোগ ছিল না। তবে হঠাৎ করেই সেই নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দেয় ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামতে আর কোনো বাধা থাকছে না যুক্তরাষ্ট্রের এই ফরোয়ার্ডের।
ট্রাম্পের ফোন নিয়ে নতুন বিতর্ক
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল দাবি করেছে, সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।
হোয়াইট হাউসের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের সেই যোগাযোগের পরই ফিফা বিষয়টি নতুন করে বিবেচনায় নেয়। সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘সঠিক কাজটি করার জন্য এবং একটি বড় অবিচারকে বদলে দেওয়ার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ।’
এদিকে মার্কিন কয়েকটি গণমাধ্যমের দাবি, বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক ও হোয়াইট হাউস টাস্কফোর্সপ্রধান অ্যান্ড্রু গিউলিয়ানিকে সঙ্গে নিয়ে বালোগানের শাস্তি চ্যালেঞ্জ করতে একটি আইনি টিমও গঠন করা হয়েছিল।
ক্ষুব্ধ বেলজিয়াম, প্রশ্ন উঠছে ফেয়ার প্লে নিয়ে
ফিফার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে বেলজিয়াম শিবির থেকে। দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এই সিদ্ধান্তে ‘স্তম্ভিত’ এবং ফুটবলের ন্যায্যতা রক্ষায় সম্ভাব্য সব আইনি পথ বিবেচনা করছে।
বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া কটাক্ষ করে বলেন, ‘আমি জানতাম না ৫ জুলাই হঠাৎ ১ এপ্রিল হয়ে গেছে। আমরা ফুটবলের নৈতিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করছি।’
গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া অবশ্য বলেন, সিদ্ধান্তটি বিস্ময়কর হলেও মাঠের লড়াইয়ে তাদের লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকবে।
আরবিএফএর দাবি, ফিফার নিজস্ব বিশ্বকাপ বিধিমালায় সরাসরি লাল কার্ডের পর এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা বাধ্যতামূলক বলে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। মে মাসে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কাছে পাঠানো সার্কুলারেও একই নিয়ম পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
পর্দার আড়ালে কী ঘটেছিল?
ট্রাম্পের ফোনের খবর প্রকাশ্যে আসার আগেই তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন ‘বারস্টুল স্পোর্টস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডেভ পোর্টনয়।
ফিফার সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি এক্সে লিখেছিলেন, ‘আমার সূত্র বলছে, খুব শিগগিরই একটি লাল কার্ড বাতিল হতে যাচ্ছে।’
সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের একটি সম্পাদিত ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেন, ‘অনেকে জানতে চাইছেন কীভাবে এটি সম্ভব হলো। একজন ভালো সাংবাদিক কখনো তার সূত্র প্রকাশ করেন না।’
এদিকে জানা গেছে, মার্কিন ফুটবল ফেডারেশনের আইনজীবীরা ফিফার কাছে আবেদন করে যুক্তি দেন, রেফারি স্লো-মোশন রিপ্লে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন এবং সেই কারণেই লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
পচেত্তিনো বললেন, তিনি জড়িত ছিলেন না
যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো জানিয়েছেন, পুরো আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত ছিলেন না।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী জেটি ব্যাডসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই বিষয়টি দেখেছেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল শুধু দলের প্রস্তুতি নেওয়া।
তবে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে পচেত্তিনো বলেন, ‘মাঠের বাস্তবতার বদলে স্লো-মোশন রিপ্লের ভিত্তিতে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন হওয়াটা ফুটবলের জন্য ইতিবাচক।’
মার্কিন ফুটবল ফেডারেশনও এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ডিসিপ্লিনারি কমিটির সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাচ্ছে এবং এখন পুরো মনোযোগ বেলজিয়াম ম্যাচে।
খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া
মার্কিন ডিফেন্ডার ক্রিস রিচার্ডস বলেন, প্রথমে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি দেখে বিশ্বাস করতে পারেননি।
অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের ভাষায়, ‘প্রথমে মনে হয়েছিল, এটা কি সত্যি? পরে নিশ্চিত হওয়ার পর দারুণ লেগেছে।’
নিজের লাল কার্ড প্রসঙ্গে বালোগান বলেন, ‘ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ছিল। আমার বিশ্বাস, এটি লাল কার্ডের মতো অপরাধ ছিল না। সর্বোচ্চ হলুদ কার্ড হতে পারত।’
কীভাবে বদলাল শাস্তি?
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি লাল কার্ড দেখলে পরের ম্যাচে নিষেধাজ্ঞা বাধ্যতামূলক। আগে সংস্থার কর্মকর্তারাও জানিয়েছিলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই।
তবে এবার ডিসিপ্লিনারি কমিটি শৃঙ্খলা বিধির ২৭ নম্বর ধারা ব্যবহার করে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করেছে। এই সময়ের মধ্যে একই ধরনের গুরুতর অপরাধ না করলে শাস্তিটি কার্যকর হবে না।
ফিফা জানিয়েছে, অতীতে একই ধরনের বিধান পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখার পর তার বাকি দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাও এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল।
যে লাল কার্ড থেকে শুরু বিতর্ক
১ জুলাই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমার্ধেই গোল করে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে দিয়েছিলেন বালোগান। ম্যাচের ৬১ মিনিটে বলের দখল নেওয়ার লড়াইয়ে বসনিয়ার মুহারেমোভিচকে পেছন থেকে ট্যাকল করেন তিনি।
ভিএআর দেখে রেফারি ৬৪ মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র শিবির থেকে সিদ্ধান্তটির তীব্র প্রতিবাদ করা হয়।
চলতি বিশ্বকাপে তিন গোল করা বালোগান দলের অন্যতম ভরসার নাম। ফলে তার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে স্বস্তি দেয়নি, বরং বিশ্বকাপের ফেয়ার প্লে, ফিফার স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।








