বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

ইরান যুদ্ধের খরচে ‘দিশাহারা’ পেন্টাগন, লাখ কোটি ডলারের বাজেটেও টান

ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের ক্রমবর্ধমান ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ পরিচালনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। মঙ্গলবার কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত এক শুনানিতে তিনি এই তথ্য তুলে ধরে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই ব্যয়ের হিসাবে যুদ্ধসংক্রান্ত নির্দিষ্ট খাতের পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের শেষ দিন ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সম্ভাব্য খরচও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে কী পদ্ধতিতে এই হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এর আগে গত মার্চে রয়টার্স এক সূত্রের বরাতে জানিয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই অন্তত ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল।

যুদ্ধের আর্থিক চাপ মোকাবিলায় গত মাসে কংগ্রেসের কাছে আরও প্রায় ৯ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থের বড় অংশই ইরান-সংক্রান্ত সামরিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় হবে। তবে সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় এই অর্থ বরাদ্দ নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সীমিত। ফলে অতিরিক্ত বরাদ্দের বিল পাস করতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। আর সেই সুযোগেই যুদ্ধের ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচকে একই আলোচনায় এনে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা জোরদার করছে বিরোধী দল।

শুনানিতে বরাদ্দবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্যাটি মারে অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। তার ভাষায়, পরিস্থিতি এমন যে এটি আরেকটি ‘অনন্তকালের যুদ্ধ’-এ পরিণত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার মতো হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ড প্রশাসনের অবস্থানকে অসংগত বলে মন্তব্য করেন। তার অভিযোগ, যুদ্ধের অগ্রগতি ও সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্য বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় জনগণের আস্থা কমে গেছে। তিনি বলেন, কখনো যুদ্ধ শেষ হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, আবার কখনো বলা হচ্ছে অভিযান চলবে; একইভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও সময়সূচি নিয়েও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।

এদিকে হেগসেথ সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না পেলে সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কমিয়ে আনার প্রয়োজন হতে পারে। তার মতে, চলমান সংঘাত পেন্টাগনের প্রায় ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব সামরিক সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং বাহিনীর প্রস্তুতির ওপরও পড়তে পারে।

শুনানিতে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, সেনাসদস্যদের বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলেও সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পেন্টাগনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্ত পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ৪৩০ জন আহত হয়েছেন। শুধু ৭ জুলাইয়ের পর আহত হয়েছেন ১০০ সেনাসদস্য। তবে তাদের মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশ ইতোমধ্যে দায়িত্বে ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা দপ্তর।

শুনানিতে হেগসেথ শুধু অতিরিক্ত জরুরি তহবিল নয়, ২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন (দেড় লাখ কোটি) ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটও অনুমোদনের আহ্বান জানান। তার ভাষায়, ‘এই বিভাগকে দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল না দেওয়াই বর্তমানে আমাদের জাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।’

চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশই আবার নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে হামলার লক্ষ্যবস্তু আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, খারগ দ্বীপের তেল স্থাপনা এবং ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত গভীর ভূগর্ভস্থ একটি পারমাণবিক স্থাপনার কথাও উল্লেখ করেছেন।

মঙ্গলবার ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ওই পাহাড়ি পারমাণবিক স্থাপনাটি ধ্বংস করবে। যুদ্ধের নতুন এই হুমকি ও বাড়তি ব্যয় মিলিয়ে ওয়াশিংটনে সামরিক কৌশল, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *