বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

সবশেষ

বিএফআইইউর তদন্তে এস আলম: ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ থেকে অর্থ পাচার, উঠে এলো নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়মের চিত্র

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মগুলোর একটি হিসেবে এস আলম গ্রুপের কার্যক্রমকে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে গ্রুপটি প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ‘এস গ্রুপ’ নামে একটি কেস স্টাডি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বিএফআইইউর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ওই কেস স্টাডিটি এস আলম গ্রুপকে কেন্দ্র করেই তৈরি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সহায়তা ব্যবহার করে গ্রুপটি দেশের ৭টি ব্যাংক ও ১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর পরিচালনা পর্ষদে নিজেদের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বসিয়ে ঋণ অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হয়।

বিএফআইইউর ভাষ্য অনুযায়ী, এই নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়, যার বড় অংশই পরবর্তীতে আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

ঋণের বিপরীতে জামানত ছিল অতি সামান্য
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মোট ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়। এর মধ্যে ৯০ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয় গ্রুপের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে এবং ৯৮ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয় বিভিন্ন বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বাকি ৩৭ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয় অন্যান্য উপায়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বিপুল ঋণের বিপরীতে ব্যাংকে রাখা বন্ধকি সম্পদের বাজারমূল্য ছিল মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা। বিএফআইইউর মতে, ঋণের পরিমাণ ও জামানতের এই বিশাল ব্যবধান দেশের ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ব্যাংকিং তদারকির বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার উদাহরণ।

ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ
কেস স্টাডিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর এস আলম গ্রুপ বৈধ ব্যবসার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শেল বা কাল্পনিক কোম্পানি গঠন করে। এরপর এসব প্রতিষ্ঠানের নামে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়।

বিএফআইইউ বলছে, এভাবে গড়ে ওঠা ঋণ বিতরণের কাঠামো ছিল পরিকল্পিত এবং তা ব্যাংকের স্বাভাবিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়।

হুন্ডি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ পাচার
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ বিদেশে পাঠাতে বিভিন্ন জটিল মানি লন্ডারিং কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে হুন্ডি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট অন্যতম।

বিএফআইইউর তথ্যমতে, এই অর্থের একটি বড় অংশ দিয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাস ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি শিথিল আর্থিক তদারকির জন্য পরিচিত কয়েকটি অফশোর অঞ্চলের সঙ্গেও গ্রুপটির যোগাযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গ্রুপটির মূল ব্যক্তিরা তিনটি ভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিএফআইইউর মতে, এই বিষয়টি ভবিষ্যতে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার অভিযোগ
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপর পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পরিবর্তন এবং নিজেদের অনুকূলে ঋণ অনুমোদনের পরিবেশ তৈরি করা হয়।

বিএফআইইউ এই পুরো ঘটনাকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি নজিরবিহীন উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এস আলম গ্রুপের প্রতিক্রিয়া মেলেনি
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত শনিবার এস আলম গ্রুপের কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে গ্রুপটির আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *