মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

ইরানি হামলার আশঙ্কা, এয়ারফোর্স ওয়ান এড়িয়ে গোপন পথে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প

ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তুরস্ক ছাড়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নেওয়া হয়েছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা। নির্ধারিত এয়ারফোর্স ওয়ানে না উঠে খাবার সরবরাহের একটি ট্রাকের মাধ্যমে তাকে গোপনে ছোট একটি সামরিক উড়োজাহাজে তুলে দেওয়া হয়। পরে সেই উড়োজাহাজেই যুক্তরাজ্যে পৌঁছান তিনি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে গতকাল সোমবার এসব তথ্য উঠে এসেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৮ জুলাই আঙ্কারা থেকে ট্রাম্পের এই গোপন যাত্রার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

ওই দিন আঙ্কারায় ট্রাম্প প্রথমে নির্ধারিত এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাকে খাবার সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত একটি ক্যাটারিং কনটেইনার ট্রাকে করে অন্য একটি উড়োজাহাজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ওই ট্রাক থেকে তাকে ছোট আকারের সি-৩২এ উড়োজাহাজে স্থানান্তর করা হয়। এই উড়োজাহাজই ট্রাম্পকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, পুরো প্রক্রিয়াটি এমনভাবে পরিচালিত হয়েছিল যাতে বাইরে থেকে মনে হয় ট্রাম্প এখনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই অবস্থান করছেন। এমনকি কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমকেও সে সময় এ বিষয়ে ভিন্ন ধারণা দেওয়া হয়েছিল।

ট্রাম্পের উড়োজাহাজ বদলের ঘটনা এর আগেও মার্কিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় এসেছিল। নিউইয়র্ক টাইমসসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র সশস্ত্র বাহিনীগুলোর সম্ভাব্য হুমকির কারণে প্রেসিডেন্টের জন্য এই পরিবর্তন করা হয়।

এর আগে, তুরস্ক যাওয়ার সময় ট্রাম্প কাতারের রাজপরিবারের উপহার হিসেবে পাওয়া একটি বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজে চড়েছিলেন। সেটিকেই দ্রুত সংস্কার করে নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় তিনি ওই উড়োজাহাজ ব্যবহার করেননি।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় আঙ্কারা থেকে উড্ডয়নের পর। পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়েছিল। এ ধরনের সতর্কতা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি বা নিরাপত্তাঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দেখা যায়। ফলে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ কোনো আশঙ্কা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে প্রকাশিত ভিডিওতেও পুরো ঘটনাটির কিছু দৃশ্য দেখা গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাম্প পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠার কয়েক মিনিট পর বিমানটির নিচ থেকে একটি ক্যাটারিং ট্রাক বেরিয়ে আসে। পরে সেটিকে অপেক্ষমাণ ছোট সি-৩২এ উড়োজাহাজের দিকে যেতে দেখা যায়।

যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর পর অবশ্য ট্রাম্পকে আবার বড় উড়োজাহাজটির সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা যায়। এরপর তিনি নতুন করে সংস্কার ও নিরাপত্তা-উন্নয়ন করা এয়ারফোর্স ওয়ানের দিকে যান। তবে ঠিক কীভাবে তিনি আবার বড় উড়োজাহাজটিতে ফিরে এসেছিলেন, তা স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।

এই ঘটনার পর কাতারের দেওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানের মতো নতুন উড়োজাহাজটিতে একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থাও রয়েছে।

১৯৯০ সাল থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহন করে আসা দুটি পুরোনো বোয়িং ৭৪৭-এর অবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তুষ্ট ছিলেন ট্রাম্প। এর মধ্যে গত বছর কাতারের রাজপরিবারের কাছ থেকে একটি বিলাসবহুল উড়োজাহাজ উপহার পান তিনি। সেটিকে দ্রুত সংস্কার ও নিরাপত্তা উন্নয়নের মাধ্যমে এয়ারফোর্স ওয়ান হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গত ১ জুলাই প্রথমবার ট্রাম্পকে নিয়ে উড়েছিল নতুন উড়োজাহাজটি। কয়েক দিন পর সেটিতে করেই তিনি তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে যান। কিন্তু ফেরার সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে সেটি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত সামনে আসায় উড়োজাহাজটির সুরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়ে।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন নিয়ে এএফপির প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউস অবশ্য নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের নিরাপত্তাব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং বলেন, নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান একটি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ এবং এতে উচ্চমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট বলেও দাবি করেন তিনি।

চিউং আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি যেমনটি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শত্রু তার ওপর নজর রাখছে। এসব হুমকি মোকাবিলায় সরকারের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর গত মাসেও হোয়াইট হাউস একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিল।

তবে আঙ্কারা থেকে ট্রাম্পের গোপন স্থানান্তরের বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাঝুঁকি কতটা গুরুতর ছিল এবং নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বাস্তবে কতটা আস্থা রাখা যাচ্ছে। তুরস্ক থেকে ফেরার সময় নেওয়া এই অস্বাভাবিক নিরাপত্তাব্যবস্থা সেই প্রশ্নকেই আরও জোরালো করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *