মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

মাটির নিচে ‘খালি বাক্স’ ভেবে হাতে নিয়েছিলেন, পরে মিলল ৯৬ মাইন

মেহেরপুরের গাংনীতে মাটি কাটতে গিয়ে পাওয়া ধাতব বস্তুগুলোকে প্রথমে সাধারণ বাক্স ভেবেছিলেন স্থানীয় কয়েকজন। কেউ আবার কৌতূহলবশত সেগুলো হাতে নিয়ে নেড়েচেড়েও দেখেছিলেন। কিন্তু দুই দিন পর জানা গেল, মাটির নিচে থাকা ওই বস্তুগুলো আসলে ছিল ৯৬টি মাইন। পরে সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল সেগুলো উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে ধ্বংস করে।

সোমবার বিকেলে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার মধুগাড়ি গ্রামের মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে চার দফা বিকট বিস্ফোরণে ধ্বংস করা হয় এসব মাইন। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন স্থানীয় অনেক মানুষ।

ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার দুপুরে। বেতবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা নুরুজ্জামান কালু নিজের জমিতে মাটি কাটার সময় প্রথমে ছয়টি ধাতব বস্তু দেখতে পান। সেগুলোর গায়ে লেখা ছিল,‘পি ডি এফ জি এল ৬৩, লট ৩৭, মাইন ১৯৬৭’।

বিষয়টি জানাজানি হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ ও বিজিবি। ঝুঁকি এড়াতে জায়গাটি ঘিরে রাখা হয়। পরে মাটির নিচে থাকা বস্তুগুলো উদ্ধারে যশোর সেনানিবাসের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ।

দুই দিন পর সোমবার দুপুরে ১৯ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দলের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর তরিকুল ইসলাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মাইনগুলো ঘটনাস্থলে নিষ্ক্রিয় না করে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সেনাসদস্যরা মাইনগুলো সংগ্রহ করে মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে নিয়ে যান। সেখানে পাঁচটি বড় গর্ত খোঁড়া হয়। মাইনগুলো বস্তায় ভরে গর্তগুলোর মধ্যে রাখা হয়। এরপর বালু ও মাটি দিয়ে গর্তগুলো ঢেকে দেওয়া হয়।

পরবর্তী ধাপে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য ইলেকট্রিক তারের সংযোগ দেওয়া হয়। এরপর সেনাসদস্যরা প্রায় ৫০০ মিটার দূরে সরে যান। নিরাপত্তার নিয়ম অনুযায়ী বিস্ফোরণের সময় তারা মাটিতে শুয়ে পড়েন।

বিকেল থেকে ধাপে ধাপে বিস্ফোরণ ঘটানো শুরু হয়। প্রথম চার দফায় সফলভাবে বিস্ফোরণ সম্পন্ন হয়। প্রতিবারই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের মাটি ও বালু ছিটকে পড়ে। শব্দে আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

স্থানীয় কৃষক হানা মিয়া, বাহাদুর, মিরন ও লালু বলেন, তারা প্রথমে ভেবেছিলেন, মাটির নিচে পাওয়া বস্তুগুলো হয়তো খালি কোনো বাক্স। কিন্তু বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর বুঝতে পারেন, সেগুলো কতটা বিপজ্জনক ছিল।

স্থানীয় নির্মাণশ্রমিক মামুন মিয়া জানান, কৌতূহল থেকে তিনি বস্তুগুলো হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেছিলেন। এগুলো যে মাইন হতে পারে এবং এতটা ভয়ংকর, তা বিস্ফোরণের আগে তার ধারণাতেই ছিল না।

এখনও পুরো এলাকা নিয়ে আতঙ্ক কাটেনি স্থানীয়দের। তাদের আশঙ্কা, মাটির নিচে বা আশপাশের জমিতে আরও কোনো বিস্ফোরক পড়ে থাকতে পারে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফার ধারণা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এসব মাইন মাটির নিচে পুঁতে রেখে যেতে পারে।

উদ্ধার হওয়া ৯৬টি মাইনের মধ্যে ১৭টি ছিল ট্যাংকবিধ্বংসী এবং ৭৯টি মানববিধ্বংসী। সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলো ধ্বংস করেছে।

গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাদ্দিদ মোরশেদ বলেন, উদ্ধার করা সব মাইন সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ওই এলাকায় আরও কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য পড়ে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সন্দেহজনক কোনো বস্তু চোখে পড়লে সেটিতে হাত না দিয়ে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।

একটি জমিতে মাটি কাটার সময় পাওয়া ছয়টি অচেনা ধাতব বস্তু থেকেই শুরু হয়েছিল ঘটনাটি। শেষ পর্যন্ত সেগুলোর সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা ৯৬টি ভয়ংকর মাইন। সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দলের তৎপরতায় সেগুলো ধ্বংস হওয়ায় আপাতত বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে রক্ষা পেয়েছে এলাকাটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *