রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

ইরান যুদ্ধে হতাশ, আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা সেই ৫ হাজার সেনা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে মার্কিন রণতরি!

দীর্ঘ ২৬৬ দিনের অভিযান শেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে যাচ্ছে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এর মধ্যে ২০০ দিনেরও বেশি সময় সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছে জাহাজটি। দীর্ঘ এই মোতায়েনের প্রভাব নিয়ে এখন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রণতরিতে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও সেনাসদস্যের মানসিক স্বাস্থ্য এবং মনোবল নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও জানিয়েছেন, পরিকল্পিত পালাবদলের অংশ হিসেবেই আব্রাহাম লিংকনকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘ যুদ্ধমিশনে থাকা সদস্যদের ওপর পড়া চাপের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

হাং কাও বলেন, মিশনের প্রয়োজনেই রণতরিটির অবস্থান নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘ করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকা এমনিতেই কঠিন; তার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ অভিযান যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।

গত ২০০ দিনের বেশি সময় কোনো বন্দরে নোঙর করেনি আব্রাহাম লিংকন। ফলে জাহাজটির নাবিকদের নিয়মিত জীবনযাত্রায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তাজা খাবারের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। আবার হামলার আশঙ্কা বাড়লে পরিবারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

নৌবাহিনীর এই কর্মকর্তা জানান, মিশন চলাকালে অল্পসংখ্যক নাবিক মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার জন্য চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে এ সময় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

তবে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা। নিউইয়র্ক টাইমস, এনবিসি নিউজসহ বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকার কারণে নাবিকদের মধ্যে মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত মাসে রণতরিটির এক নাবিক পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। পরে তিনি আবার দায়িত্বে ফিরেছেন, নাকি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

নাবিকদের পরিবারের অভিযোগ, জাহাজে খাদ্য ও পানির সংকটের পাশাপাশি ডাক বা চিঠিপত্রের যোগাযোগেও সমস্যা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব। ফলে অনেক নাবিক এখন মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো বন্দরে বিরতির চেয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সান ডিয়েগোতে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক টাউন হল সভায় বিষয়টি নিয়ে নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পরিবারের সদস্যরা। বিশেষ করে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ জানান। তবে সভায় এসব প্রশ্নের বিষয়ে কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।

নৌবাহিনী অবশ্য জানিয়েছে, রণতরিতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য পরামর্শক, চ্যাপলিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং জরুরি সহায়তাসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা রয়েছে।

হাং কাও অবশ্য রণতরির নাবিক ও মেরিন সেনাদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে দেখতে রাজি নন। তার মতে, দীর্ঘ ও কঠিন অভিযানের মধ্যেও তারা এবং তাদের পরিবার অসাধারণ দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।

আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে সান ডিয়েগোর নিজ ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে মার্কিন অভিযানকে সহায়তার জন্য এটিকে পশ্চিম এশিয়ায় পাঠানো হয়।

মিশন চলাকালে রণতরিটি ১০ হাজারের বেশি উড্ডয়ন অভিযান পরিচালনা করেছে এবং প্রায় ১৫ লাখ পাউন্ডের গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছেন হাং কাও। তার দাবি, মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলোর মধ্যে আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের মোতায়েনের হার অন্যতম সর্বোচ্চ।

দীর্ঘ এই যুদ্ধযাত্রার প্রশংসা করে হাং কাও বলেন, মার্কিন তরুণ নারী-পুরুষদের সক্ষমতার শেষ সীমা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, এত দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধ অভিযান অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের চাপ তৈরি করে। তাই সামরিক নেতৃত্বকে যুদ্ধের প্রয়োজনের সঙ্গে সেনাসদস্যদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।

নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারির ভাষায়, সামরিক সদস্যদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দেশে ফেরার পর আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের জন্য বড় ধরনের অভ্যর্থনার আয়োজন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজে থাকা নাবিকদের প্রত্যাশাও এখন খুব সীমিত। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা আর নতুন কোনো বন্দরে বিশ্রাম চান না; বরং দ্রুত দেশে ফেরার একটি নিশ্চিত তারিখ চান। দীর্ঘ যুদ্ধমিশনের শেষ প্রান্তে এসে তাই আব্রাহাম লিংকনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন সামরিক অভিযান নয়, বরং কখন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবেন এর নাবিকেরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *