শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

হাসপাতাল বানালেই হবে না, চিকিৎসকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

দেশে আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত প্রযুক্তি ও চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার মতে, চিকিৎসকরা যদি কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং রোগী-স্বজনের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হয়, তাহলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও চিকিৎসার জন্য দেশের মানুষের বিদেশমুখিতা বন্ধ করা কঠিন হবে।

শনিবার (১৫ আগস্ট) ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন-২ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার অর্থ কেবল নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা নয়। উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষ জনবল, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয় ঘটিয়ে সবার জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

নতুন ভবনে বাড়বে নিউরোচিকিৎসার সক্ষমতা
৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধনের ফলে দেশে বিশেষায়িত নিউরোচিকিৎসার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, স্ট্রোক, ইপিলেপসি, পারকিনসন্স, ডিমেনশিয়া এবং মেরুদণ্ডের বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসার চাহিদা দেশে ক্রমেই বাড়ছে। নতুন ভবনে আধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা ও বিশেষায়িত ওয়ার্ড থাকায় রোগী চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।

সাধারণ মানুষ যাতে তুলনামূলক কম খরচে বিশ্বমানের নিউরোচিকিৎসা পেতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই ‘নিউরোসায়েন্স-২’ নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

নতুন ভবন উদ্বোধনের মাধ্যমে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে দেশ আরও এক ধাপ এগিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, চিকিৎসক, নার্স, হেলথ টেকনিশিয়ানসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

চিকিৎসায় প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিকতার গুরুত্ব
তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও একজন রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বোঝার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মানবিক আচরণের বিকল্প নেই।

রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার মানসিক অবস্থা বোঝা এবং সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা চিকিৎসাসেবার মান বাড়ায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর মতে, হাসপাতালের পরিবেশ নিরাপদ ও কার্যকর রাখার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসকদের নয়। চিকিৎসক, রোগী এবং রোগীর স্বজনদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতি থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন কিংবা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসকদের বিশ্বাস ও মর্যাদার সম্পর্ক না থাকে, তাহলে শুধু হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন করে চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা যাবে না।

ইউনিয়ন পর্যায়েও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ
স্বাস্থ্যসেবা যেন কেবল বড় শহর বা সামর্থ্যবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে রাজধানীতে ছুটে আসতে না হয়, সে লক্ষ্যে ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে আধুনিক রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বর্তমান সরকারের মেয়াদে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

অক্টোবরে চালুর লক্ষ্য পাঁচ শিশু হাসপাতাল
শিশুদের স্বাস্থ্যসেবাকেও সরকারের অগ্রাধিকারে রাখার কথা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘সুস্থ আগামী’ নিশ্চিত করতে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এর অংশ হিসেবে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী বিভাগ এবং কুমিল্লা জেলায় ২০০ শয্যার একটি করে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর কাজ চলছে। আগামী অক্টোবর মাসে পাঁচটি হাসপাতাল একযোগে চালু করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের উল্লেখ
স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার দাবি, এর মধ্য দিয়ে সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যকে শুধু বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি।

দেশের মানুষ যাতে দেশের ভেতরেই প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা পান, এমন একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে অবকাঠামো ও অর্থের পাশাপাশি চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের দায়িত্বশীল ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হওয়ার প্রত্যয়
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় যেখানে চিকিৎসার জন্য কোনো নাগরিককে বিদেশে যেতে হবে না এবং অর্থের অভাবে কেউ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না।

তার মতে, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন স্বাস্থ্য খাতের কর্মীরা। তাই অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষতা, মানবিকতা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করেই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *