ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও কয়েক ধাপ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন।
সোমবার ওয়াশিংটনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযানের ঘোষণা দেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের ক্ষমতাসীন সরকারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখে, এমন প্রতিটি পথ বন্ধ করাই নতুন অভিযানের মূল লক্ষ্য।
বেসেন্ট বলেন, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ যতদিন প্রয়োজন, ততদিন অভিযান চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু ইরানের তেল খাত নয়, দেশটির অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত বিমান চলাচল, সমুদ্রপথে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, স্বর্ণের খনি ও ডিজিটাল সম্পদের মতো খাতও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হবে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ইরানের হুমকি শুধু নিয়ন্ত্রণে রাখার বদলে এবার সেটির মূল অর্থনৈতিক ভিত্তিই দুর্বল করতে চায় ওয়াশিংটন। এ জন্য ইরানের বিরুদ্ধে আগের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসছে ইরানের সহযোগীরাও
নতুন অভিযানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য শুধু ইরানের সরকারি প্রতিষ্ঠান বা তেল কোম্পানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা, তেল বাণিজ্য বা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজগুলোকেও টার্গেট করা হবে।
বেসেন্ট জানান, গত কয়েক দিনেই ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগে বিশ্বজুড়ে ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ইরানের তেলকে অর্থে পরিণত করার পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হবে। তেহরানের মিত্রদেরও এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, তেল পাচার ও নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ইরান যেসব কেন্দ্র, নেটওয়ার্ক ও সহায়তাকারী ব্যবহার করে, সেগুলো শনাক্ত করতে ট্রেজারি কর্মকর্তারা কাজ করেছেন। ওয়াশিংটন এমন একটি নীতি অনুসরণ করছে, যার লক্ষ্য ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ‘শূন্য লিকেজ’ নিশ্চিত করা।
‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরে কেউ নেই’
স্কট বেসেন্টের বক্তব্যে সবচেয়ে কড়া বার্তাগুলোর একটি ছিল ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশে।
তিনি জানান, যারা ইরানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করলে অংশীদারত্বের সুবিধা পাওয়া যাবে; অন্যদিকে ইরানের বর্তমান শাসনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলে তার পরিণতির অংশীদার হতে হবে বলেও সতর্কবার্তা দেন তিনি।
অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের নতুন কৌশল শুধু তেহরানকে চাপ দেওয়া নয়; ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককেও বিচ্ছিন্ন করা।
এক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্পের হুমকি
নতুন অভিযানের ঘোষণা অবশ্য হঠাৎ আসেনি। এর প্রায় এক সপ্তাহ আগে, ১৯ আগস্ট ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে শিগগিরই ‘এযাবৎকালের সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর কয়েক দিন ধরে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি ও উত্তেজনার মধ্যেই সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করা হলো।
তেলের গণ্ডি ছাড়িয়ে চাপের বিস্তার
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপের ফলে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। এতদিন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বড় অংশজুড়ে ছিল তেল রপ্তানি, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক।
এবার বিমান চলাচল, জাহাজ পরিবহন, প্রযুক্তি, স্বর্ণ ও ডিজিটাল সম্পদের মতো খাতও একই চাপের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
ওয়াশিংটনের লক্ষ্য স্পষ্ট, ইরানের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ যতটা সম্ভব সংকুচিত করা এবং দেশটির ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা কঠিন করে তোলা।
বেসেন্টের ঘোষণা অনুযায়ী, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ কোনো স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নয়। তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে না করা পর্যন্ত এ অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।








