সংসারের অভাব ঘোচাতে সাত লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের জাকির হোসেন। দেশে রেখে গিয়েছিলেন স্ত্রী ও এক বছরের সন্তানকে। বিদেশে গিয়ে চাকরিও পেয়েছিলেন। বেতন ছিল প্রায় ৬০ হাজার টাকা। তবে ঋণের বোঝা থাকায় নিজের খরচ মিটিয়ে পরিবারকে খুব বেশি টাকা পাঠাতে পারতেন না।
এর মধ্যেই জীবনে নতুন আশার খবর আসে। চাকরিতে পদোন্নতি হয় জাকিরের। স্ত্রীকে ফোন করে আনন্দের সঙ্গে বলেছিলেন, এবার বেতন বাড়বে, ঋণ শোধ করা সহজ হবে, পরিবারের কষ্টও কমবে।
কিন্তু সেই স্বপ্ন এক মাসও টিকল না। রাশিয়ার আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রাণ হারালেন জাকির। বাড়িতে এখন আর বেতন বাড়ার অপেক্ষা নেই, নেই স্বামীর ফেরার প্রতীক্ষাও, স্বজনদের অপেক্ষা শুধু তার মরদেহ দেশে ফেরার।
গত মঙ্গলবার আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বিস্ফোরণে ১৫ জন নিহত হন। তাদের একজন জাকির হোসেন। গত বৃহস্পতিবার তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জাকিরের বাড়ি ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামে। আট মাস আগে তার বাবা রতন মিয়া মারা যান। পরিবারে রয়েছেন মা রোকেয়া বেগম, স্ত্রী রিপা বেগম, এক সন্তান ও তিন ভাই।
অটোরিকশা চালানো থেকে রাশিয়ায় পাড়ি
জাকিরের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। সামান্য কৃষিজমি থাকলেও তা দিয়ে সংসার চলত না। তার দুই ভাই দেলোয়ার হোসেন (২৪) ও শরিফ হোসেন (২২) অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন। ছোট ভাই নূর আলম রিকশা চালান।
সংসারের ব্যয় মেটাতে জাকিরও ভৈরবের সড়কে অটোরিকশা চালাতেন। কিন্তু বড় পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় একপর্যায়ে তাকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার।
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাত লাখ টাকা খরচ করে জাকিরকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে চার লাখ টাকা আসে জমি বিক্রি করে। আরও দুই লাখ টাকা নেওয়া হয় এনজিও থেকে ঋণ করে। বাকি টাকাও ধারদেনা করে জোগাড় করতে হয়।
৬০ হাজার টাকা বেতন, তবু ঋণের চাপ
রাশিয়ায় আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে চাকরি পেয়েছিলেন জাকির। তার মাসিক আয় ছিল বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০ হাজার টাকা।
তবে বিদেশে থেকেও পরিবারের আর্থিক চাপ পুরোপুরি কাটেনি। নিজের খরচের পর বাড়িতে যে টাকা পাঠাতেন, তার বড় অংশই চলে যেত ঋণ পরিশোধে। এখনো পরিবারের প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ রয়েছে।
এর মধ্যেই চাকরিতে পদোন্নতি পান জাকির। বেতন বাড়বে, এই খবরে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন তিনি।
‘আল্লাহ মুখ ফিরে তাকাইছে’
জাকিরের স্ত্রী রিপা বেগম জানান, পদোন্নতির খবর পেয়ে তার স্বামী খুব খুশি ছিলেন। ফোন করে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার কথা জানিয়েছিলেন।
রিপা বলেন, ‘প্রমোশন পাওয়ার পর আমার স্বামী অনেক খুশি ছিল। ফোন করে বলছিল, “আর কষ্ট করতে হবে না। ঋণ শোধ করতেও সমস্যা হবে না। আল্লাহ মুখ ফিরে তাকাইছে। আমার প্রমোশন হইছে, বেতন বাড়বে। তোমরাও এখন থেকে ভালোমন্দ খাইয়া-পইরা চলতে পারবা।”’
এরপরই কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘মাস শেষ হয়নি। কী ভাগ্য আমার! মাস শেষ হওয়ার আগেই আমার স্বামী চলে গেল।’
‘আমি আমার স্বামীর পোড়া লাশটা দেখতে চাই’
রাশিয়ায় জাকিরের সঙ্গে তার চাচাতো ভাই আলী হোসেনও থাকতেন। গত শুক্রবার তিনিই পরিবারকে জাকিরের মৃত্যুর খবর জানান।
খবর পাওয়ার পর থেকেই আতকাপাড়ার বাড়িতে নেমে এসেছে শোক। টিনশেডের পুরোনো ঘরটির সামনে প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন। এক বছরের সন্তান তায়েবাকে নিয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন রিপা বেগম।
স্বামীর মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা রিপা বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি আর কিছু চাই না। আমি আমার স্বামীর পোড়া লাশটা দেখতে চাই।’
‘পোলারে বিদেশে পাঠাইলাম, এহন পুইড়া অঙ্গার’
ছেলের মৃত্যুর পর থেকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন জাকিরের মা রোকেয়া বেগম। অভাব দূর করার আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তই এখন তার কাছে অসহনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোকেয়া বলেন, ‘অভাব দূর করতে পোলারে বিদেশে পাঠাইলাম। জমিজমা শেষ। এহন আমার পোলা পুইড়া অঙ্গার। আল্লাহগো, এমন মরণ হইব জানলে পোলারে বিদেশ পাঠাইতাম না।’
ঋণের বোঝা, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
স্বজন মাহাবুবুর রহমান জানান, জাকিরকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারকে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়েছে। এখনো সেই ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ হয়নি। জাকিরের মৃত্যুর পর পরিবার কীভাবে ঋণ শোধ করবে এবং কীভাবে সংসার চলবে, সেটিই এখন বড় দুশ্চিন্তা।
বিশেষ করে জাকিরের স্ত্রী ও ছোট সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা। তাদের দাবি, দ্রুত জাকিরের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, জাকিরের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা করা হবে। পরিবারটি আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল হওয়ায় তাদের সরকারি সহায়তা দেওয়া যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।








