জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই রায়ে তাদের মধ্যে পাঁচজনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাজেয়াপ্ত সম্পদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সাতজন হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামিই পলাতক।
রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে তাদের মধ্যে চারজনের ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, সম্পদের ধরন ও পরিমাণে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য।
কাদেরের সম্পদ ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ আসনের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় ওবায়দুল কাদের তার সম্পদের বিবরণ দিয়েছিলেন।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তার হাতে নগদ ছিল ৮০ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা ছিল প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা।
কাদেরের নামে একটি গাড়ি রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয় ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২৫ তোলা সোনার মূল্য দেখানো হয়েছিল দেড় লাখ টাকা। এ ছাড়া ৯ লাখ ২০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার আসবাবপত্র থাকার তথ্য দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে তার অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে ঢাকার উত্তরায় ৫ কাঠা জমির তথ্য রয়েছে। ওই জমির মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৫১ লাখ টাকা।
অর্থাৎ হলফনামায় ঘোষিত হিসাবে কাদেরের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য প্রায় ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী, এর অর্ধেক বাজেয়াপ্ত হবে।
নাছিমের সম্পদ ৩৫ কোটি টাকার বেশি
চার নেতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ ঘোষণা করেছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হলফনামায় নাছিমের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ দেখানো হয় ৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ব্যাংকে ছিল ৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
বিভিন্ন কোম্পানিতে তার শেয়ার ও বন্ডের মূল্য ছিল ১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। সঞ্চয়পত্র ছিল ৬০ লাখ টাকার। তার দুটি গাড়ির মূল্য প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। ২৫ ভরি সোনার মূল্য দেখানো হয় সাড়ে ৩ লাখ টাকা।
ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রের মূল্য ছিল সোয়া ১০ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে নাছিমের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে মাদারীপুর ও সাভারে ১৩৯ শতাংশ কৃষিজমি রয়েছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাজীপুরে তার অকৃষি জমি রয়েছে ১৫৩ শতাংশ। এসব জমির মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ঢাকার উত্তরায় একটি ভবনের মূল্য ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৪৫ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।
স্থাবর সম্পদের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
অর্থাৎ হলফনামায় ঘোষিত হিসাবে নাছিমের স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অনুযায়ী এর অর্ধেক বাজেয়াপ্ত হওয়ার কথা।
আরাফাতের বড় সম্পদ গুলশানের অ্যাপার্টমেন্ট
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ২০২৪ সালের নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি।
হলফনামায় নিজের নামে থাকা স্থাবর সম্পদের মধ্যে রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টের তথ্য দেন আরাফাত। এর মূল্য দেখানো হয় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া তার নামে অন্য কোনো স্থাবর সম্পদের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
অস্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারে তার বিনিয়োগই বড় অংশ। নয়টি কোম্পানিতে তার শেয়ার রয়েছে, যার মোট মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
এর বাইরে ৩৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ১৭ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাড়ি এবং ৩ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রীর তথ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে আরাফাতের নিজের নামে ঘোষিত অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
অর্থাৎ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে তার ঘোষিত সম্পদের মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এর অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করা হবে।
নিখিলের সম্পদের বড় অংশ এফডিআর ও যানবাহনে
ঢাকা-১৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের হলফনামাতেও জমি, ব্যাংক আমানত, শেয়ার ও যানবাহনের তথ্য রয়েছে।
স্থাবর সম্পদের তালিকায় একটি কৃষিজমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ একর। এর মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আরেকটি কৃষিজমি ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, যার মূল্য ২৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
তিন কাঠার একটি অকৃষি প্লটের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৬০০ টাকা। বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট শ্রেণিতে তার ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬১০ টাকার সম্পদের তথ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে নিখিলের ঘোষিত স্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ৬৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
অস্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে তার হাতে নগদ রয়েছে ২৪ লাখ টাকার কিছু বেশি। নিজের নামে ১ কোটি টাকার একটি এফডিআর রয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার শেয়ারের মধ্যে নাবিল প্রোপার্টিজে ৮ লাখ টাকা এবং নাবিল প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ে ৬২ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে।
তিনটি যানবাহনের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা।
হলফনামায় নিখিলের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ সাড়ে ৫ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।
আগের রায়েও সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
সেই রায়েও তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
এবার ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হলো।
ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাস্তবায়ন হলে এসব সম্পদের মূল্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে ব্যবহৃত হওয়ার কথা রয়েছে।








