সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

নুসুকের জটিলতা এড়িয়ে দেশীয় কোটায় হজ, প্রবাসীদের সামনে নতুন ঝুঁকি

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্রিটিশ-বাংলাদেশি দ্বৈত নাগরিক ও অন্যান্য প্রবাসীদের একটি অংশ সৌদি আরবের ‘নুসুক হজ’ প্ল্যাটফর্মের জটিলতা এড়িয়ে বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। যুক্তরাজ্য থেকে সরাসরি হজের আবেদন না করে তারা বাংলাদেশের হজ কোটা ও স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সির প্যাকেজের মাধ্যমে সৌদি আরবে যাচ্ছেন।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একই সময়ে হজে যাওয়ার সুযোগ, দেশে স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা এবং তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তবে সুবিধার পাশাপাশি এ পথে রয়েছে দীর্ঘ ভ্রমণ, জরুরি চিকিৎসা ও কনস্যুলার সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দ্বৈত নাগরিকদের জন্য কিছু আইনি জটিলতা।

বিশেষ করে নুসুক প্ল্যাটফর্মে পরিবারের সদস্যদের আবেদন একসঙ্গে অনুমোদন না পাওয়ার অভিযোগ প্রবাসীদের বিকল্প পথ খুঁজতে উৎসাহিত করছে। একই পরিবারের কেউ অনুমোদন পেলেও অন্য সদস্যের আবেদন আটকে যাওয়া কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবেদন বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নারী হজযাত্রীদের মাহরাম-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তার সঙ্গেও প্ল্যাটফর্মের একক অনুমোদন ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে পরিচিত বাংলাদেশি এজেন্সির মাধ্যমে হজের প্যাকেজ নিশ্চিত করাকেই তুলনামূলক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মনে করছেন অনেক প্রবাসী।

বাড়ছে দেশীয় হজ অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ
প্রবাসীদের এই প্রবণতা শুধু তাদের ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের হজ ও এভিয়েশন ব্যবসাতেও। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের দুই মৌসুমে তুলনামূলক বেশি খরচের কারণে দেশের হজ কোটার প্রায় ৪০ হাজার স্লট খালি থেকে যায়। সেই জায়গায় প্রবাসীদের একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ায় স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সি, বিমান পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতে বাড়তি অর্থপ্রবাহ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাজ্য থেকেই এসেছে ৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার।

দেশে এসে হজের প্যাকেজ কেনা, অভ্যন্তরীণ বিমান ভ্রমণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে প্রবাসীদের ব্যয়ের ফলে পর্যটন ও সেবা খাতও উপকৃত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশের আবাসস্থল সিলেট হওয়ায় সেখানকার ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এই চাহিদার অন্যতম সুবিধাভোগী।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে হজযাত্রীদের সেবা দিয়ে আসা লতিফ ট্রাভেলসও প্রবাসীদের বাড়তি আগ্রহের বিষয়টি লক্ষ্য করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জহিরুল চৌধুরী শিরু জানিয়েছেন, গত মৌসুমে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি হাজির পাশাপাশি শত শত প্রবাসীকেও তারা সেবা দিয়েছেন। আগামী মৌসুমে প্রবাসীদের চাহিদা আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তার মতে, প্রবাসীরা কাঙ্ক্ষিত বছরে হজে যাওয়ার নিশ্চয়তা এবং তুলনামূলক কম খরচের বিষয়টি বিবেচনা করেই বাংলাদেশের এজেন্সিগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।

সুবিধার পাশাপাশি বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষায়
বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধা থাকলেও প্রবাসীদের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে জরুরি পরিস্থিতিতে কনস্যুলার সহায়তা নিয়ে। কারণ বাংলাদেশি কোটায় ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সৌদি আরবে প্রবেশ করলে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে তারা বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবেই বিবেচিত হন।

ফলে হজের সময় অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে জেদ্দা কিংবা রিয়াদের ব্রিটিশ দূতাবাসের কনস্যুলার সহায়তা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দায়িত্ব মূলত বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশন ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় এজেন্সির ওপরই বর্তায়।

এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে দীর্ঘ ভ্রমণের শারীরিক চাপ। যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশ হয়ে সৌদি আরবে যাওয়া এবং হজ শেষে একই পথে যুক্তরাজ্যে ফেরার যাত্রা বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ প্রবাসীদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে।

দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়টিও জটিলতা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সৌদি আরবে প্রবেশের পর হজ শেষে সরাসরি যুক্তরাজ্যে ফেরার সময় ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করলে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে বিড়ম্বনায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদিতে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা সীমিত
সৌদি আরবের কঠোর হজ বিধিমালার কারণে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ হজ পালনের ক্ষেত্রে সহজে প্রয়োগ করা যায় না। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এবং সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পর্যটন ভিসা বা ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) ব্যবহার করে হজ পালন বৈধ নয়।

ফলে নুসুকের বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশি কোটা ব্যবহার করলেও প্রবাসীদের সামনে থেকে যাচ্ছে একাধিক বাস্তব ও আইনি প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের পরামর্শ, শুধু প্যাকেজের মূল্য বা হজের নিশ্চয়তা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বুকিংয়ের আগে জরুরি চিকিৎসা, দুর্ঘটনা, আইনি জটিলতা এবং কনস্যুলার সহায়তার ক্ষেত্রে এজেন্সির দায়িত্ব কী, এসব বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা নেওয়া জরুরি।

অর্থাৎ নুসুকের প্রযুক্তিগত জটিলতা এড়িয়ে বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ার পথ প্রবাসীদের জন্য কিছু সুবিধা তৈরি করলেও, সেই সুবিধার আড়ালে থাকা দীর্ঘ যাত্রা, আইনি সুরক্ষা ও জরুরি সহায়তার ঝুঁকিগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *