শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার এখন সিঙ্গাপুর, তবে কর্মী নিয়োগে সামনে কড়াকড়ির শঙ্কা

একসময় বাংলাদেশের কর্মীদের প্রধান গন্তব্যগুলোর বাইরে থাকা সিঙ্গাপুর এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক শ্রমবাজারে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৫ হাজার ৬১৪ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজের জন্য সিঙ্গাপুরে গেছেন। তবে একই সময়ে দেশটিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ আরও নিয়ন্ত্রিত করার ইঙ্গিত দিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার। ফলে এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া মোট ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৬৩৭ বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশের গন্তব্য ছিল সিঙ্গাপুর।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার ধারাবাহিকতা দেখা যায়। ২০২২ সালে ৬৪ হাজার ৩৮৩ জন, ২০২৩ সালে ৫৩ হাজার ২৬৫ জন এবং ২০২৪ সালে ৫৬ হাজার ৮৪৭ জন বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরে যান। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ হাজার ৮৩২ জনে। ওই বছর বিদেশে যাওয়া মোট ১১ লাখ ২৩ হাজার ৩৬৮ জন কর্মীর মধ্যে সিঙ্গাপুরের অংশ ছিল ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এ বছর সিঙ্গাপুরের অবস্থান আরও ওপরে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ওমান, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে কর্মী নিয়োগে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সিঙ্গাপুরের গুরুত্ব বেড়েছে। সৌদি আরব অবশ্য ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬৯৫ কর্মী নিয়ে এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার।

শ্রমবাজারের পাশাপাশি রেমিট্যান্সেও উত্থান
বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুরের গুরুত্ব শুধু কর্মী যাওয়ার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশটি ক্রমেই বড় রেমিট্যান্স উৎসে পরিণত হচ্ছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৮৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৪২৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে ৬৩২ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৮০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিঙ্গাপুর থেকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ আরও বেড়ে ১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে দেশটি দশম বৃহত্তম উৎসে পরিণত হয়েছে।

বিদেশি কর্মী নিয়োগে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চায় সিঙ্গাপুর
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সিঙ্গাপুরের বাজার সম্প্রসারণের মাঝেই দেশটির নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

গত ২৩ আগস্ট ন্যাশনাল ডে র‍্যালিতে দেওয়া ভাষণে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং বলেন, তার দেশ বিদেশি কর্মীদের স্বাগত জানানো অব্যাহত রাখবে, তবে তা হবে ‘সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে’। একই সঙ্গে তিনি জানান, আগামী বছরগুলোতে দেশটির মোট জনসংখ্যা এবং শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে।

ওং বলেন, সিঙ্গাপুরে স্থানীয় নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা হবে। পরিষেবা খাতের ব্যবসাগুলো বিদেশি কর্মীদের আরও সহজলভ্য করার দাবি জানালেও তিনি সতর্ক করেন, নীতিতে সামান্য শিথিলতাও বিদেশি কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। তার মতে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতার ভূমিকা বাড়াতে হবে।

পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন না বিশেষজ্ঞ
মাইগ্রেশন বিশেষজ্ঞ ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদারের মতে, সিঙ্গাপুরের নীতিগত কড়াকড়িকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

টিবিএসকে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য বাজার পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ দেশটির অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অভিবাসী শ্রমিকের প্রয়োজন রয়েছে।

তবে তার মতে, পরিবর্তন আসতে পারে কর্মীর ধরনে। স্বল্প ও অর্ধদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ ও উচ্চদক্ষ কর্মীদের চাহিদা বাড়তে পারে।

সিঙ্গাপুরের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ বিদেশি কর্মী। আনুমানিক ২ লাখ বাংলাদেশি সেখানে নির্মাণ, জাহাজ নির্মাণ ও বাগান পরিচর্যার মতো কাজে যুক্ত রয়েছেন।

এর পাশাপাশি দেশটি তীব্র জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে সিঙ্গাপুরের মোট প্রজনন হার ১ দশমিক ২৪ থেকে কমে ২০২৫ সালে শূন্য দশমিক ৮৭-এ নেমেছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন সিকদার। তার ভাষায়, সিঙ্গাপুর প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও হাই-টেক শিল্পে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে শুধু সাধারণ অর্ধদক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সুযোগ সীমিত হতে পারে।

দক্ষতার জায়গায়ও পিছিয়ে বাংলাদেশি কর্মীরা
সিঙ্গাপুরে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের সাধারণত নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে দক্ষতার সনদ নিতে হয়। বাংলাদেশে প্রায় ২২টি ট্রেডে, বিশেষ করে নির্মাণ খাতকেন্দ্রিক সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য কয়েকটি বিশেষায়িত কেন্দ্র অনুমোদিত রয়েছে।

তবে স্থানীয় রিক্রুটারদের দাবি, সিঙ্গাপুরের নিয়োগকর্তারা একাধিক দক্ষতার সনদ থাকা কর্মীদের তুলনামূলক বেশি পছন্দ করছেন। ফলে নতুন ধরনের দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কর্মীদের একটি অংশ পিছিয়ে পড়ছে।

১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ, বাড়ছে উদ্বেগ
সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজার নিয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ অভিবাসন ব্যয়। সম্প্রতি দেশটিতে যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মী টিবিএসকে জানিয়েছেন, চাকরি নিশ্চিত করতে তাদের ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে।

টাঙ্গাইলের লুৎফর মিয়া ১৯৯৬ সালে ২ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নতুন কর্মীদের সিঙ্গাপুর যেতে খরচ ১৪ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরের ছয়টি কোম্পানি মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একচেটিয়া প্রভাব ধরে রেখেছে এবং এর ফলে কর্মীদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক পরিমাণ অর্থ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি টিবিএসকে বলেন, প্রকৃত অভিবাসন ব্যয় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে থাকার কথা হলেও কর্মীদের কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোকে ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমাতে সিঙ্গাপুরের বিল্ডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন অথরিটি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গেও বাংলাদেশ আলোচনা করেছে।

পরিসংখ্যানে নতুন কর্মীর সংখ্যা নিয়ে সতর্কতা
সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানকে সরাসরি নতুন অভিবাসীর সংখ্যা হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সিঙ্গাপুরে কর্মী পাঠানো এজেন্সিগুলোর একটি সংগঠনের সাবেক মহাসচিব আহমেদ চৌধুরী।

তার মতে, সিঙ্গাপুরে যাওয়া কর্মীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নতুন অভিবাসী নন। তাদের অনেকেই আগে সেখানে কাজ করেছেন এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে ফিরে নতুন ভিসা বা ক্লিয়ারেন্স নিয়ে আবার সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন। ফলে বিএমইটির হিসাবে সিঙ্গাপুরে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও এর পুরোটা নতুন বাংলাদেশি কর্মীর প্রবেশকে নির্দেশ করে না।

নির্মাণ খাতে চাহিদা এখনো শক্তিশালী
বিদেশি কর্মীর ওপর সিঙ্গাপুরের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও দেশটির নির্মাণ খাতে শ্রমিকের চাহিদা এখনো রয়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের নির্মাণ খাত বছরওয়ারি ১১ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকেও খাতটির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ।

নির্মাণ খাতের এই প্রবৃদ্ধি বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখছে। একই সময়ে সিঙ্গাপুরের নীতিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ আরও নিয়ন্ত্রিত ও দক্ষতাভিত্তিক করার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।

ফলে বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজার পুরোপুরি সংকুচিত হওয়ার চেয়ে কর্মীর ধরন, দক্ষতা এবং অভিবাসন ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসার বিষয়টিই এখন বড় আলোচনার জায়গা হয়ে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *