বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

ম্যান্ডারিন ভাষা জানলেই খুলছে চীনের দুয়ার, বাড়ছে বাংলাদেশিদের সুযোগ

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই বাড়ছে ম্যান্ডারিন ভাষা জানা মানুষের প্রয়োজন। একসময় কেবল অনুবাদক, কূটনীতিক কিংবা চীন-বিষয়ক গবেষকদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা এমনকি চীনে বসবাসের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এই ভাষা।

বাংলাদেশে বসেই ম্যান্ডারিন শেখার পর চীনা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছেন গাজীপুরের নাজমুল ইশতিয়াক (নাহিদ)। ২০২২ সালের শুরুতে দুই মাসের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর নিজ উদ্যোগে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। ছয় মাসের মধ্যে ভাষাটির প্রাথমিক দক্ষতা অর্জনের পর একই বছরের মাঝামাঝি একটি চীনা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন।

চীনা সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করতে গিয়ে দ্রুতই বাড়তে থাকে তার ভাষাজ্ঞান। চাকরির দুই বছরের মাথায় পদোন্নতিও পান। এরপর ২০২৫ সালে কোম্পানি তাকে চীনে নিয়ে যায়। বর্তমানে শাওসিং শহরের ‘শাওশিং বাইবু টেক্সটাইল কোম্পানি লিমিটেড’-এ রিজিয়নাল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

নাজমুলের ভাষাশিক্ষার অভিজ্ঞতা বলছে, বইয়ের জ্ঞান আর বাস্তব জীবনের চর্চার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেন, ‘২০২২ সালের মাঝামাঝিতে চাকরি পাওয়ার পর চীনা নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার সুযোগ হয়। এটিই ছিল আমার ভাষা শেখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। পদোন্নতির পর ২০২৫ সালে কোম্পানি আমাকে চীনে নিয়ে আসে। এখন আমি রিজিয়নাল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছি। কোম্পানির মালিক আমাকে খুব আপন করে নিয়েছেন, যার মূলে ছিল এই ভাষা জানা। ভাষা না জানলে আমি কখনওই এত দূর আসতে পারতাম না।’

নাজমুলের অভিজ্ঞতা এখন আর একক কোনো উদাহরণ নয়। চীনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, দেশে চীনা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে দুই দেশের মানুষের সরাসরি যোগাযোগের জায়গাগুলোতে ম্যান্ডারিন জানা ব্যক্তিদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষার পথেও বাড়ছে ম্যান্ডারিনের গুরুত্ব
চীনে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখন দেশ ছাড়ার আগেই ম্যান্ডারিন শেখার চেষ্টা করছেন। চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।

প্রযুক্তি, চিকিৎসা, ব্যবসাসহ নানা বিষয়ে এসব শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাদের জন্য চীনের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তির সুযোগও রয়েছে।

রাজশাহীর সাদিকুল ইসলাম ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশে ম্যান্ডারিন শেখা শুরু করেন। চার মাস পর সেপ্টেম্বরে চীনে গিয়ে ভর্তি হন জিয়াংজি প্রদেশের ইস্ট চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে (ECUT)। বর্তমানে ইলেকট্রনিক ইনফরমেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন তিনি।

সাদিকুল বলেন, ‘আমার চীনে আসার প্রস্তুতি শুরু হয় বাংলাদেশ থেকেই। ২০২৪ সালের মে মাসে ম্যান্ডারিন শেখা শুরু করি, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল উচ্চশিক্ষায় চীনে আসার আগে ভাষাটির মৌলিক ধারণা নেওয়া। বাংলাদেশে চার মাস শেখার পর একই বছরের সেপ্টেম্বরে চীনে আসি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও নতুন করে চীনা ভাষা শেখার সুযোগ পাই।’

বাংলাদেশে থাকতেই তিনি HSK-1 সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু চীনে যাওয়ার পর বুঝতে পারেন, শ্রেণিকক্ষে ভাষা শেখা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার অভিজ্ঞতা এক নয়।

তার ভাষায়, ‘চীনে আসার পর বুঝি, শ্রেণিকক্ষে বই পড়ে ভাষা শেখা আর স্থানীয়দের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্পূর্ণ আলাদা। শুরুতে ভাষাগত জড়তার কারণে সমস্যা হতো, বিশেষ করে তারা যখন দ্রুত কথা বলত। তাই জড়তা কাটাতে চাইনিজ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, দোকানে কেনাকাটা করা ও খাবার অর্ডার দেওয়ার মতো দৈনন্দিন কাজে সরাসরি ভাষাটি ব্যবহারের চেষ্টা করি।’

এই চর্চার ফলে ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এখন দৈনন্দিন কাজে অনুবাদ অ্যাপ কিংবা দোভাষীর ওপর আগের মতো নির্ভর করতে হয় না।

সাদিকুলের পরামর্শ, চীনে উচ্চশিক্ষা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পরিকল্পনা থাকলে বাংলাদেশ থেকেই ম্যান্ডারিনের প্রাথমিক জ্ঞান নিয়ে যাওয়া সুবিধাজনক। এরপর চীনে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।

২০২৫ সালে ছয় মাসের ম্যান্ডারিন কোর্স করতে চীনে যান কুমিল্লার ফয়সাল আহমেদ। ভাষা শেখার পর বর্তমানে তিনি জিয়াংসু ইনস্টিটিউট অব কমার্সে আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিষয়ে ডিপ্লোমা করছেন।

ফয়সাল বলেন, ‘আমি জিয়াংসু ইনস্টিটিউট অব কমার্সে স্কলারশিপ পেয়েছি। দেশ থেকে ভাষা শিখে আসা কিংবা চীনে এসে ভাষা কোর্স সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্যই এখানে নানাবিধ সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।’

HSK-তে দক্ষতা বাড়লে মিলছে বৃত্তির সুযোগ
চীনে পড়তে আগ্রহীদের কাছে ম্যান্ডারিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো HSK বা চীনা ভাষা দক্ষতা পরীক্ষা।

চীনের গান্নান নরমাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে স্নাতক শেষ করেছেন বগুড়ার মো. ইনফিতার ইসলাম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চীনা ভাষার পুরোনো কাঠামোয় HSK-1 থেকে HSK-6 পর্যন্ত ছয়টি স্তর রয়েছে।

ইনফিতার বলেন, ‘HSK-4 অর্জন করতে পারলে চীনে ডিপ্লোমা, ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে আকর্ষণীয় বৃত্তির দুয়ার খুলে যায়। এই বৃত্তির আওতায় সম্পূর্ণ টিউশন ফি ও আবাসন খরচ মওকুফের পাশাপাশি মাসিক আর্থিক ভাতা (স্টাইপেন্ড) দেওয়া হয়। এমনকি কেউ HSK-3 সম্পন্ন করলেও কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে সমমানের বৃত্তির সুযোগ পেতে পারেন।’

তার মতে, চীনে পড়াশোনার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবন ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারেও ম্যান্ডারিন জানা বাড়তি সুবিধা তৈরি করে।

গবেষণাগার থেকে করপোরেট ক্যারিয়ার
ম্যান্ডারিনের প্রয়োজন শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীনে গবেষণারত বাংলাদেশিরাও পেশাগত কাজে ভাষাটির ব্যবহারিক গুরুত্ব অনুভব করছেন।

বেইজিং ইউনিভার্সিটি অব কেমিক্যাল টেকনোলজি থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে একই গবেষণাগারে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে পিএইচডি করছেন খুলনার শেখ রায়হান উদ্দিন। পাশাপাশি একটি একাডেমিতে ম্যান্ডারিন শিখছেন তিনি।

রায়হানের ভাষায়, গবেষণাপত্র বা থিসিস ইংরেজিতে লেখা হলেও ল্যাবের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ম্যানুয়াল, সফটওয়্যার ইন্টারফেস এবং প্রশাসনিক কাজের বড় অংশ চীনা ভাষায় হওয়ায় ভাষাটি জানা বাস্তব কাজে সহায়তা করে।

তিনি বলেন, ‘ভাষা জানা থাকলে ল্যাবে কাজের ক্ষেত্রে অন্যের ওপর নির্ভরতা কমে এবং সহকর্মীদের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক বিষয়ে গভীর আলোচনা সম্ভব হয়।’

তার মতে, ম্যান্ডারিনে দক্ষতা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতেও কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়।

চীনা বিনিয়োগ বাড়ায় দেশেও তৈরি হচ্ছে চাহিদা
বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের শ্রমবাজারেও ম্যান্ডারিন জানা কর্মীদের চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫১০টিরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। চীনা দূতাবাসের প্রতিবেদনে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ বাংলাদেশির কর্মসংস্থান তৈরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশে বসেই চীনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্যও ভাষাটি একটি কার্যকর দক্ষতা হয়ে উঠছে। টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম থাকায় কর্মক্ষেত্রে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজনও বাড়ছে।

ব্যবসায় দোভাষীর বিকল্প সরাসরি ভাষাজ্ঞান
চীনের সঙ্গে ব্যবসা করেন এমন বাংলাদেশিদের কাছেও ম্যান্ডারিন এখন কৌশলগত দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চীন থেকে নিয়মিত পণ্য আমদানি করেন সুনামগঞ্জের এস এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ভাইপার প্লাস’-এর স্বত্বাধিকারী।

তার মতে, চীনা ভাষা জানা থাকলে ব্যবসায় মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরতা কমে। একই সঙ্গে সরাসরি উৎপাদক ও সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে পণ্যের দাম, মান ও সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা করা যায়।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘চীনা ভাষা আজ আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অন্যতম শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য, যাদের কাঁচামাল ও মূল আমদানির প্রধান উৎস চীন; চীনা ভাষার জ্ঞান ব্যবসা সম্প্রসারণে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন ব্যবসায়ীর জন্য ম্যান্ডারিন জানার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মধ্যস্থতাকারী বা দোভাষীর ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়া। এতে একদিকে যেমন ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষা পায় ও খরচ কমে, অন্যদিকে চীনের মূল উৎপাদক ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরাসরি দরকষাকষি করে পণ্যের সেরা মূল্য ও গুণগত মান নিশ্চিত করা সহজ হয়।’

চীনা ব্যবসায়িক সংস্কৃতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি ‘গুয়াংশি’ বা ব্যক্তিগত আস্থা ও সুসম্পর্কের গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন। তার অভিজ্ঞতায়, একজন বিদেশি যখন চীনা ভাষায় যোগাযোগ করেন, তখন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে সেটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চীনে বসবাসেও কমছে ভাষার বাধা
পেশা ও শিক্ষার বাইরেও চীনে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের দৈনন্দিন জীবনে ম্যান্ডারিনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

বেইজিংয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত মো. জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে একটি একাডেমিতে ম্যান্ডারিন শিখছেন।

তার অভিজ্ঞতায়, ট্যাক্সিচালক, ডেলিভারি কর্মী, বাড়িওয়ালা কিংবা দোকানির সঙ্গে যোগাযোগের সময় ভাষাগত সীমাবদ্ধতা নানা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই সমস্যা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বিশেষ করে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভাষাগত জটিলতায় পড়তে হয় সবচেয়ে বেশি। নিজের শারীরিক সমস্যা, ব্যথা বা উপসর্গ চিকিৎসককে স্পষ্টভাবে বোঝানো না গেলে ভুল চিকিৎসার বড় ঝুঁকি থেকে যায়।’

তার মতে, ম্যান্ডারিন জানা থাকলে চীনে চলাফেরা, কেনাকাটা, দাপ্তরিক কাজ এবং স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক সহজ হয়। একই সঙ্গে চীনা সংস্কৃতি, ইতিহাস, খাবার ও বিনোদনও অনুবাদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশেই বাড়ছে শেখার সুযোগ
চীনে যাওয়ার আগেই ম্যান্ডারিন শেখার সুযোগও এখন বাংলাদেশে আগের চেয়ে বিস্তৃত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের কার্যক্রম চালু হয়েছে। শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে রয়েছে কনফুসিয়াস ক্লাসরুম।

এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মেয়াদের ভাষা কোর্সের পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্কলারশিপ-সংক্রান্ত সহায়তা এবং HSK পরীক্ষার আয়োজন করা হচ্ছে। এর বাইরে বেসরকারি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সংখ্যাও বাড়ছে।

গুলশানের ‘চাইনিজ পাঠশালা’র স্বত্বাধিকারী আব্দুর রাফি জানান, ২০২২ সালে ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে পাঁচটি ব্যাচে প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী পড়ছেন।

তার ভাষ্য, চীনে শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন ও চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের যাতায়াত বাড়ার পাশাপাশি দেশে চীনা বিনিয়োগ ও নির্মাণকাজ সম্প্রসারিত হওয়ায় ম্যান্ডারিন জানা মানুষের চাহিদাও বাড়ছে।

অন্যদিকে ‘শেখো চাইনিজ একাডেমি’র পরিচালক রাকিব হাসান জানান, ২০২২ সালে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা তাদের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। চার বছরে প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থী সেখান থেকে ম্যান্ডারিন শিখেছেন।

রাকিব হাসান বলেন, ‘চীনে উচ্চশিক্ষায় গমনেচ্ছুদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত চীনা ভাষা জানা এখন প্রায় বাধ্যতামূলক। এছাড়া, দেশীয় বাজারে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস ও কনস্ট্রাকশন খাতে কর্মরত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ভাষা জানা বাংলাদেশিদের অগ্রাধিকার তৈরি হচ্ছে।’

চার দশকে বদলেছে ভাষাটির ব্যবহার
বাংলাদেশিদের কাছে ম্যান্ডারিনের গুরুত্ব যে নতুন নয়, তার একটি দীর্ঘ উদাহরণ লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেনের অভিজ্ঞতা। ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি চীনা ভাষা শেখার জন্য চীনে যান।

পরবর্তী সময়ে ভাষাজ্ঞান তাকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পর্যায়ে কাজের সুযোগ এনে দেয়। ২০০১–২০০২ সালে বাংলাদেশ ও চীনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই ভাষাটিই আমার জীবনকে এক নতুন অর্থ ও পরিচয় এনে দিয়েছে।’

তার মতে, ম্যান্ডারিন এখন কেবল কূটনীতি বা গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিধি বাড়ার সঙ্গে ভাষাটির ব্যবহারও বিস্তৃত হয়েছে।

বাংলাদেশের জনশক্তিকে আরও দক্ষ করে তুলতে ম্যান্ডারিন শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু সাধারণ কর্মী পাঠানোর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে চীনা প্রকল্পে বাংলাদেশের কর্মীদের উচ্চতর পেশাগত সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চীনে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, ম্যান্ডারিন জানা চিকিৎসক, নার্স, সমন্বয়কারী ও দোভাষীদের জন্য এ ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে চীন-বাংলাদেশের শিক্ষা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও মানুষের যোগাযোগ যত বাড়ছে, ম্যান্ডারিনের ব্যবহারও তত বিস্তৃত হচ্ছে। কারও জন্য এটি বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতি, কারও জন্য চাকরি বা ব্যবসার হাতিয়ার; আবার কারও কাছে চীনে দৈনন্দিন জীবন সহজ করার মাধ্যম।

নাজমুল, সাদিকুল, ফয়সাল, ইনফিতার ও রায়হানদের অভিজ্ঞতা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যান্ডারিন শেখার প্রয়োজনীয়তাও আর কেবল ভাষা শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি হয়ে উঠছে শিক্ষা, পেশা ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি ব্যবহারিক দক্ষতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *