বিদেশে কর্মী পাঠানোর পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্য থাকলেও বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান এখনো কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। মোট প্রবাসী কর্মীর প্রায় ৯৪ শতাংশই মাত্র সাতটি দেশে যাচ্ছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। ফলে এসব বাজারে নিয়োগ কমলে কিংবা কোনো কারণে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানে।
অন্যদিকে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার তুলনামূলক উচ্চ-মজুরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি। বিদেশে যাওয়া কর্মীদের বড় অংশই কম দক্ষ বা আধা-দক্ষ হওয়ায় সম্ভাবনাময় নতুন বাজারের চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের কর্মীদের যোগ্যতার মিল হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশে যাওয়া কর্মীর প্রায় ৭৭ শতাংশই কম দক্ষ বা আধা-দক্ষ
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন।
তবে তাদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ ছিলেন কম দক্ষ এবং ৩৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ আধা-দক্ষ কর্মী। দক্ষ কর্মীর হার ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর পেশাজীবী ছিলেন মাত্র ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
অর্থাৎ বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৭৭ শতাংশই কম দক্ষ অথবা আধা-দক্ষ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর হিসাবেও প্রায় একই চিত্র উঠে এসেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ পেশাজীবী এবং ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিত্রই নতুন শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা।
একের পর এক বাজার বন্ধ, নির্ভরতা বাড়ছে কয়েকটি দেশের ওপর
গত এক দশকে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া ও ব্রুনাইসহ বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ রেখেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে লাওসও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার বড় অংশ কয়েকটি প্রচলিত বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে এসব দেশে নিয়োগ পরিস্থিতি বদলালে সামগ্রিক বৈদেশিক কর্মসংস্থানেও তার প্রভাব পড়ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৮৯ জন কর্মী বিদেশে গেলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ২১ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯৪ হাজার ১৮৯ জনে।
সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪ লাখ ৮৬ হাজার ২৫ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মার্চেই বিদেশে গেছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৫ জন।
আর জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে কর্মী বিদেশে যাওয়ার হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তায় নতুন করে চাপ
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো কার্যকর অগ্রগতি আসেনি। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজারগুলোতেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার হার কমেছে। অন্যদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাপানে বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তারও উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন এখনো দেখা যাচ্ছে না।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও গত সাত মাসে প্রায় ৪ লাখ ৩৪ হাজার কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
তার ভাষ্য, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকার শ্রমবাজার ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করছে এবং সামনে আরও ভালো ফল পাওয়ার আশা রয়েছে।
নতুন বাজারে চাহিদা আছে, ঘাটতি দক্ষ কর্মীর
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো চাহিদা ও দক্ষতার মধ্যে ব্যবধান।
ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং বিশেষায়িত নির্মাণ খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এসব খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে পর্যাপ্ত কর্মী যেতে পারছেন না।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের দক্ষতা অর্জন জরুরি।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি দক্ষ কর্মী পাঠাতে না পারি, তবে লাখ লাখ কর্মী পাঠিয়ে দেশের কোনও প্রকৃত লাভ হবে না। এ জন্য বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স, ট্রেনিং এগুলোর ব্যবস্থা করছি। এখান থেকে গিয়ে যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে।’
মন্ত্রী জানান, পশ্চিম এশিয়ার বাইরে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে নতুন শ্রমবাজার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এ বিষয়ে ভালো ফলাফল পাওয়ার আশা করছে সরকার। একই সঙ্গে যেসব খাত ও দেশে আগে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি হয়নি, সেগুলো চিহ্নিত করে কাজ করা হচ্ছে।
অভিবাসন ব্যয় ও অনিয়মও বড় বাধা
অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, আইন লঙ্ঘন এবং দক্ষ কর্মীর ঘাটতিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের অভিজ্ঞতাকেও এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন তারা।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের পর দেশটির আনুষ্ঠানিক প্রত্যাখ্যান বাজারটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনাকে ধাক্কা দিয়েছে।
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি কার্যকর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ঘাটতির কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি বড় বাজারেও নতুন কর্মী নিয়োগ আটকে আছে।
শাকিরুল ইসলাম আরও বলেন, বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো এখনো শক্তিশালী অভিবাসনকেন্দ্রিক কূটনীতি গড়ে ওঠেনি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কর্মীদের ঋণের বোঝায় ফেলছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে।
শুধু ‘কতজন গেল’ দিয়ে সাফল্য মাপার সময় শেষ
সরকার চলতি অর্থবছরে ১৪ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী জানান, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে বর্তমান ধারায় কাজ চললে এই লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের রয়েছে।
তার মতে, নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বর্তমান প্রচেষ্টার মাত্রা আরও বাড়াতে হবে এবং বিদেশে কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
তবে অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, এতদিন বিদেশে কত লাখ কর্মী পাঠানো হয়েছে, সেটিকেই বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক শ্রমবাজারে এখন কর্মীর দক্ষতা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ভাষাজ্ঞান, সংশ্লিষ্ট পেশায় অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী না গেলেও ৬০ থেকে ৭০ লাখ কর্মী পাঠানো সম্ভব। তবে তার মতে, কর্মী পাঠানোর সংখ্যা একাই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।
তার ভাষায়, কত কম খরচে একজন কর্মী বিদেশ যেতে পারছেন এবং বিদেশে গিয়ে সেই খরচ তুলতে পারছেন কিনা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ছে কিনা, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু কতজন কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন, তা নয়। বরং নতুন বাজারে প্রবেশ, আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং বিদেশে পাঠানো কর্মীদের জন্য নিরাপদ ও টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।








