বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

সবশেষ

মালদ্বীপে কাগজপত্রহীন বাংলাদেশিদের বৈধ হওয়ার সুযোগ, যা করণীয়

মালদ্বীপে কর্মরত যেসব বাংলাদেশির অভিবাসন বা চাকরিসংক্রান্ত কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, তাদের জন্য বৈধ হওয়ার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনথিভুক্ত বিদেশি শ্রমিকদের বিশেষ প্রক্রিয়ায় নিয়মিত করার সুযোগ দেবে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাদের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ, লেবার রিলেশনস অথরিটি অথবা সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

মালদ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আইনি অবস্থান, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে দেশটির সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। বুধবার (৪ নভেম্বর) মালদ্বীপের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শ্রম ও প্রযুক্তিমন্ত্রী আলী ইহুসানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম।

বৈঠকে অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বৈধকরণ ছাড়াও বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, বেতন-ভাতা, নিয়োগকর্তাদের জবাবদিহি এবং বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়।

সময়সীমা পেরোলেও মিলবে নিয়মিত হওয়ার সুযোগ
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মালদ্বীপে অনথিভুক্ত বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও যেসব বিদেশি নাগরিক বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, কিন্তু তাদের অভিবাসন বা চাকরিসংক্রান্ত নথিপত্র অসম্পূর্ণ, তাদের বিশেষ প্রক্রিয়ায় নিয়মিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাদের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ, লেবার রিলেশনস অথরিটি কিংবা সংশ্লিষ্ট সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, কাগজপত্রের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও যারা বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, তাদের জন্য বৈধ অবস্থান নিশ্চিত করার একটি সুযোগ রয়েছে। তবে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে নিয়োগকর্তার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশি কর্মীদের ৯৮ শতাংশের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন
মালদ্বীপে বিদেশি কর্মীদের পরিচয় ও আইনগত অবস্থান নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কার্যক্রমেও অগ্রগতি হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের প্রায় ৯৮ শতাংশের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

এ অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের হাইকমিশনার বলেন, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন প্রবাসীদের আইনগত অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করবে।

বৈঠকে বিভিন্ন দ্বীপে অবস্থানরত অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়। একই সঙ্গে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, বৈধকরণ, শ্রমিকদের অধিকার এবং সরকারি সেবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।

নিয়োগকর্তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গেও ব্যবস্থা নেওয়ার আলোচনা
মালদ্বীপে বাংলাদেশি কর্মীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো নিয়োগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না পাওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার পর নির্ধারিত কাজের ব্যবস্থা না করা কিংবা কর্মী কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বৈঠকে এসব বিষয়ে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে কিংবা নিয়োগসংক্রান্ত শর্ত লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া কোনো কর্মী কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। আটক বিদেশি কর্মীদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়েও মন্ত্রী অবহিত করেন।

বেতন ও রেমিট্যান্সে স্বচ্ছতা চায় বাংলাদেশ
মালদ্বীপে কর্মরত অধিকাংশ বাংলাদেশি পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে বিদেশে কাজ করছেন। তাদের উপার্জিত অর্থ যেন নিরাপদে দেশে পৌঁছায়, সে জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার।

বৈঠকে তিনি বলেন, বাংলাদেশি কর্মীদের ব্যাংক হিসাব খোলা, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো এবং বেতনের একটি অংশ সরাসরি বাংলাদেশে স্থানান্তরের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে মালদ্বীপের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

একই সঙ্গে নিয়োগচুক্তিতে উল্লেখ করা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশি কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করার বিষয়টিও তুলে ধরেন হাইকমিশনার।

সমস্যা সমাধানে দুই দেশের সমন্বিত উদ্যোগ
মালদ্বীপে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য দুই দেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা।

বিশেষ করে বিভিন্ন দ্বীপে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের তথ্য বিনিময়, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, অনথিভুক্তদের বৈধকরণ এবং শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে যৌথ কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে নিয়মিত যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন উভয় পক্ষ।

মালদ্বীপে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলেও বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের নিয়মিত হওয়ার বিশেষ সুযোগের বিষয়টি দেশটির সরকার স্পষ্ট করেছে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *