দেশের সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে স্মার্টফোন পৌঁছে দিতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তিনি বলেছেন, সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু স্পেকট্রাম বিক্রি করে রাজস্ব আয় বাড়ানো নয়; বরং শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করা।
শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ: নতুন সরকার কী ভাবছে?’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
রেহান আসিফ আসাদ জানান, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় ডেটা সেন্টার, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তাকে সরকার অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সময়োপযোগী নীতি, আধুনিক অবকাঠামো এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।
তিনি আরও বলেন, টেলিকম খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ভবিষ্যতে এই খাত থেকে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান আসতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশের টেলিকম খাতকে বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় বলেও জানান উপদেষ্টা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে একটি পাঁচ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। বাজেট ঘোষণার পর সেই রোডম্যাপ প্রকাশ করা হবে এবং এতে নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা হবে, যাতে বিনিয়োগকারী বা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনিশ্চয়তা না থাকে।
তিনি বলেন, গত ছয় সপ্তাহে টেলিকম খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে সরকার। সেখানে উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা, চাহিদা ও প্রত্যাশার কথা শোনা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, এ খাতে করের চাপ তুলনামূলক বেশি। যদিও দেশের সামগ্রিক ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত এখনও কম। বর্তমানে টেলিকম খাত সরকারের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর রাজস্ব উৎস হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
করহার কমানো হলে তার কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে বিশ্লেষণ চলছে বলেও জানান রেহান আসিফ। তবে এক বাজেটেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও বাস্তবভিত্তিক সমাধানের পথে এগোতে চায় সরকার। তিনি বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের মতো ইলেকট্রনিকস খাতকেও বিশেষ সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ সময় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানান, টেলিকম কানেক্টিভিটি উন্নয়নে সরকার একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির নির্দেশ দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজ এগিয়ে চলছে। তিনি বলেন, স্পেকট্রামের দাম কমানো হলে সরকারের রাজস্ব কিছুটা কমতে পারে, তবে জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েই বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য এখনও পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সরকার ব্যবসায়িক লাভের চেয়ে সেবা নিশ্চিত করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। টেলিটককে বরাদ্দ দেয়া স্পেকট্রাম নিয়েও কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী বলেন, নিলামের পর যে ফ্রিকোয়েন্সিগুলো অবিক্রীত ছিল, সেগুলো টেলিটককে দেয়া হয়েছে। অন্যথায় সেগুলো ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকত। তিনি জানান, টেলিটকের পরিচালন ব্যয়ে সরকার কোনো ভর্তুকি দেয় না। জ্বালানি সংকটের সময় বিটিআরসি ডিজেল সরবরাহে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি টেলিটক তাদের প্রাপ্ত স্পেকট্রাম ব্যবহারে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা সরকারের কাছে জমা দেবে বলেও জানান তিনি।
গোলটেবিল আলোচনায় অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, অতীতে টেলিকম খাতে বৈষম্য ছিল। তিনি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিজিটালাইজেশন এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, ডেটা সেন্টারগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এআইভিত্তিক ডেটা সেন্টার গড়ে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
তিনি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই সহজ করার পাশাপাশি ট্যাক্সের চাপ কমিয়ে খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে রবির হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার সাহেদ আলম বলেন, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি ডিজিটাল ইকোনমি রোডম্যাপ, ভবিষ্যৎ উপযোগী টেলিকম নীতি, নীতিগত সংস্কার, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডেটা গভর্নেন্সের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান।








