ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতকে ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজনের চিত্র সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি সমন্বিত সামরিক জোট গঠনের চেষ্টা করেছিল। তবে সৌদি আরব ও কাতার সেই উদ্যোগে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ইরানে হামলার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়। এর জবাবে তেহরান উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশকে লক্ষ্য করে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রায় তিন হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হানে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ বিভিন্ন নেতার সঙ্গে ফোনালাপে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু সৌদি আরব ও কাতারসহ অন্য নেতারা সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার নীতিগত দূরত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। একসময় অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থে একসঙ্গে চললেও ইরান ইস্যুতে তাদের অবস্থানে এখন দৃশ্যমান পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত আকারে পাল্টা ব্যবস্থা নিলেও তারা দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিশেষ করে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক সমাধানের উদ্যোগে রিয়াদ সক্রিয় সমর্থন দেয়।
অন্যদিকে, ইউএই আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়। তারা ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলাকালে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের লাভান দ্বীপে হামলা চালানো হয়। এতে সেখানে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং কয়েক মাসের জন্য উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিলেও এই হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওই সময়কার এমন সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের কাছে বিকল্প জ্বালানি রপ্তানি রুট থাকলেও ইউএইর অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সরাসরি পারস্য উপসাগরের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের চাপ আমিরাতের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের কারণে পর্যটন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে দেশটির ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানে রাখতে আবুধাবি প্রকাশ্য ও গোপন, দুইভাবেই কূটনৈতিক তৎপরতা চালায়। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জবাবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাবও উত্থাপন করে ইউএই। তবে সেটি শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি।
এদিকে ইউএইর প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ইরানের হামলার পর জিসিসি কার্যকর কোনো ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। এই অসন্তোষের জের ধরে চলতি মে মাসে ইউএই ওপেক জোট থেকেও নিজেদের প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়লেও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি জানিয়েছেন, ইরানের হামলা প্রতিরোধে ইসরায়েল ইউএইতে ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সহায়তা পাঠিয়েছে।
তেল আবিবে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরায়েল ও ইউএইর সম্পর্ক এখন কৌশলগত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং সেই সম্পর্কের ভিত্তিতেই নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে নিজেদের ঘনিষ্ঠ সামরিক যোগাযোগ প্রকাশ্যে স্বীকার করার ক্ষেত্রে এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আবুধাবি। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করে, যুদ্ধ চলাকালে তিনি ইউএই সফর করেছিলেন। কিন্তু আমিরাত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো সফরের তথ্য অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়টি নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন, গণহত্যা বিষয়ক গবেষক এবং একাধিক বিশ্বনেতা ওই অভিযানের সমালোচনা করেছেন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসিও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।








