সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সবশেষ

পারমাণবিক স্থাপনায় মাইন বসাল ইরান, মার্কিন অভিযান কি সত্যিই ঠেকানো সম্ভব?

মার্কিন সামরিক অভিযান কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দের সম্ভাবনা সামনে রেখে নিজেদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে ইরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি তাদের গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম সংরক্ষণাগারের সঙ্গে যুক্ত কিছু সুড়ঙ্গ পরিকল্পিতভাবে ধসিয়ে দিয়েছে এবং কয়েকটি প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন পুঁতে রেখেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে ইরানের মজুত থাকা প্রায় আধা টন উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার, জব্দ বা ধ্বংস করার যেকোনো সম্ভাব্য অভিযান আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু মাইন পুঁতে রাখলেই কি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য অভিযান ঠেকানো সম্ভব?

ইরান আসলে কী ঠেকাতে চাইছে?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এখানে ‘অভিযান’ বলতে শুধু বিমান হামলার কথা বলা হচ্ছে না। যদি যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হয় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া, জব্দ করা বা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করা, তাহলে সেটি অনেক ক্ষেত্রে স্থলভিত্তিক বিশেষ অভিযানও হতে পারে। অর্থাৎ কোনো পর্যায়ে বিশেষ বাহিনী, প্রকৌশল ইউনিট কিংবা পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের স্থাপনার ভেতরে প্রবেশ করতে হতে পারে। আর ঠিক এই জায়গাতেই মাইনের গুরুত্ব তৈরি হয়।

কেন মাইন কার্যকর হতে পারে?
পারমাণবিক স্থাপনা সাধারণ সামরিক ঘাঁটির মতো নয়। এসব স্থাপনায় সাধারণত সীমিত প্রবেশপথ, সংকীর্ণ টানেল, বহুস্তর নিরাপত্তা এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল উপকরণ থাকে।

কোনো বিশেষ বাহিনী যদি সেখানে প্রবেশ করতে চায়, তাহলে তাদের নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করেই ভেতরে যেতে হবে। প্রবেশপথের সামনে কিংবা টানেলের ভেতরে মাইন পুঁতে রাখা থাকলে অগ্রসর হওয়ার আগে সেগুলো শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে হবে।

শুনতে সাধারণ মনে হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। আর বিশেষ বাহিনীর অভিযানে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মিনিটের বিলম্বও কখনো কখনো পুরো অভিযানের ফলাফল বদলে দিতে পারে। কারণ এই সময়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনী পুনর্গঠিত হতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সরিয়ে ফেলা হতে পারে বা পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

শুধু মাইন নয়, ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে সুড়ঙ্গও
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান শুধু মাইন বসিয়েই থেমে থাকেনি। কিছু সুড়ঙ্গ ইচ্ছাকৃতভাবে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ কোনো পারমাণবিক স্থাপনায় ঢোকার জন্য যদি একাধিক বিকল্প পথ থাকে, তাহলে আক্রমণকারী বাহিনী একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে অন্য পথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সুড়ঙ্গ ধসিয়ে দিলে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

ফলে মাইন ও ধসে যাওয়া টানেল একসঙ্গে একটি “বহুস্তর প্রতিরক্ষা” তৈরি করে, যা যেকোনো উদ্ধার বা জব্দ অভিযানকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র থেমে যাবে?
এখানেই আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন। মাইন বাধা তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা কি যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারবে, সম্ভবত না। কারণ আধুনিক সামরিক অভিযানে কোনো বাহিনী সরাসরি অজানা এলাকায় প্রবেশ করে না। এর আগে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি।

স্যাটেলাইট নজরদারি, ড্রোন পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, স্থাপনার নকশা বিশ্লেষণ এবং ইলেকট্রনিক নজরদারির মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি বিস্তারিত চিত্র তৈরি করা হয়।

এ ছাড়া মার্কিন বাহিনীর কাছে বিশেষায়িত মাইন-ক্লিয়ারিং প্রযুক্তি, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী রোবট, প্রকৌশল ইউনিট এবং ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় অভিযানের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ফলে মাইন একটি বড় বাধা হতে পারে, কিন্তু অতিক্রম-অযোগ্য দেয়াল নয়।

আসল শক্তি কি মাইন, নাকি স্থাপনাগুলোর অবস্থান?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সবচেয়ে বড় সুবিধা মাইন নয়। বরং তাদের অনেক পারমাণবিক স্থাপনা পাহাড়ের গভীরে কিংবা শক্তিশালী কংক্রিটের স্তরের নিচে নির্মিত। এসব স্থাপনায় পৌঁছানোই অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থাৎ মাইন এখানে মূল প্রতিরক্ষা নয়; বরং গভীর ভূগর্ভস্থ অবস্থান, সীমিত প্রবেশপথ, শক্তিশালী বাঙ্কার এবং সশস্ত্র নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর।

তাহলে ইরানের উদ্দেশ্য কী?
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। সামরিক কৌশলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য সব সময় শত্রুকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দেওয়া নয়। অনেক সময় উদ্দেশ্য থাকে শত্রুর সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তোলা। ইরানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখছেন।

কারণ যদি কোনো সম্ভাব্য অভিযানে বেশি সময় লাগে, বেশি ঝুঁকি তৈরি হয় এবং বেশি রাজনৈতিক দায় তৈরি হয়, তাহলে সেই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তও কঠিন হয়ে যায়। অর্থাৎ মাইনের উদ্দেশ্য হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করা নয়; বরং ওয়াশিংটনকে এই হিসাব করতে বাধ্য করা, অভিযানের সম্ভাব্য লাভ কি এর ঝুঁকি ও ব্যয়ের চেয়ে বেশি?

নতুন চ্যালেঞ্জ কোথায়?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতের কোনো পারমাণবিক চুক্তিকেও জটিল করে তুলতে পারে।

যদি কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া বা ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে সেই কাজ বাস্তবায়নের জন্যও স্থাপনাগুলোতে নিরাপদ প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু সুড়ঙ্গ ধসিয়ে দেওয়া এবং মাইন পুঁতে রাখার ফলে ভবিষ্যতে তেহরান দাবি করতে পারে যে কিছু উপকরণে পৌঁছানো সম্ভব নয় কিংবা তা উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বিষয়টি শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতাও তৈরি করতে পারে।

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মাইন পুঁতে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অভিযানকে নিঃসন্দেহে আরও কঠিন, ধীর এবং ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে যদি লক্ষ্য হয় স্থাপনায় প্রবেশ করে ইউরেনিয়াম জব্দ বা অপসারণ করা।

তবে শুধু মাইন দিয়ে কোনো বড় সামরিক শক্তিকে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ, যার উদ্দেশ্য অভিযানকে ব্যয়বহুল করা, সময় বাড়ানো এবং প্রতিপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও কঠিন করে তোলা। সেই অর্থে, মাইন ইরানের জন্য হয়তো চূড়ান্ত ঢাল নয়, কিন্তু সম্ভাব্য অভিযানের খরচ ও ঝুঁকি বাড়ানোর একটি কার্যকর কৌশলগত বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *