চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন ভারতে পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পালানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তিনি ভারতীয় আধার কার্ড তৈরি করেছিলেন, যেখানে তার নাম ব্যবহার করা হয়েছে ‘আজহার খান’।
পুলিশের দাবি, আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় যোগাযোগের জন্য ইমন সাধারণ মোবাইল সিম ব্যবহার করতেন না। বিদেশি নম্বর ও বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে তিনি যোগাযোগ বজায় রাখতেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
এর আগে, বুধবার সকালে যশোর থেকে ভারতে যাওয়ার পথে ইমনকে তার তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি চট্টগ্রামের পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে ১৫টি মামলা রয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে ইমনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ওই মামলার অন্যতম আসামি রাউজানের ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াসকে ২২ জুলাই ঢাকার কাছ থেকে গ্রেপ্তারের পর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় পুলিশ।
মাসুদ আলম বলেন, ইলিয়াসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইমনের অবস্থান ও তার সহযোগীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ধারণা পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও ভাঙচুরের ঘটনাতেও ইলিয়াসের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
পুলিশ সুপার বলেন, আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীরা সাধারণত নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে সিম ব্যবহার এড়িয়ে চলে। ইমনও একই কৌশল অনুসরণ করতেন। গ্রেপ্তারের আশঙ্কা তৈরি হলে তিনি বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ ওরফে বড় সাজ্জাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তার পরামর্শে ভারত পালানোর পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।
তিনি জানান, ভারতে প্রবেশের জন্য ইমনের প্রস্তুতি আগে থেকেই ছিল। তার কাছে পাওয়া ভারতীয় আধার কার্ডে নাম দেওয়া হয়েছে ‘আজহার খান’।
ইমনকে ধরতে পুলিশের অভিযান প্রসঙ্গে এসপি মাসুদ আলম জানান, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে দাউদকান্দিতে তাকে আটক করার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। পরে তিনি ও তার সহযোগীরা গাড়ি পরিবর্তন করেন এবং চালকও বদলে ফেলেন।
পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, ইমন খুলনার দিকে যাচ্ছেন। এরপর পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় চেকপোস্ট বসানো হয়। মুন্সিগঞ্জ পুলিশও সহায়তা করে। তবে সেখানেও তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
পরে খুলনা ও রূপসা এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হলে ইমনরা আবার অবস্থান পরিবর্তন করেন। গোপালগঞ্জ থেকে নড়াইলের দিকে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত যশোর পুলিশের সহায়তায় ভোরের দিকে ঝুমঝুমপুর এলাকায় ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মাসুদ আলম বলেন, অভিযান চলার সময় বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী কিছু কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। একই সময়ে চট্টগ্রামের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অবস্থান করছিলেন। পুলিশের আরেকটি দল সেখানে অভিযান চালালেও ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যান তিনি।
পুলিশ সুপার জানান, ইমনের ভারতে যাওয়ার রুট হিসেবে যশোরের ঝিকরগাছা সীমান্ত ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। কে তাকে সীমান্ত পার করাবে এবং ভারতে কে গ্রহণ করবে, এসব বিষয়ও আগে থেকে ঠিক করা ছিল বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
ইমনের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হবে বলে জানান পুলিশ সুপার।
রাজনৈতিক কোনো পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এসপি মাসুদ আলম বলেন, এখন পর্যন্ত ইমন ও তাঁর সহযোগীদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো রাজনৈতিক গডফাদারের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা অপরাধ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কে এই ডেভিড ইমন
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের পরিচিত নাম। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ায় জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসে।
পুলিশ জানায়, ইমনের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। তাঁর কাছে ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলেও দাবি পুলিশের।
বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় অস্ত্র সরবরাহ ও মোটরসাইকেল ব্যবস্থাপনায় ইমনের ভূমিকা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, বিদেশে অবস্থানরত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী দুই ব্যক্তির একজন ইমন, অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর তারা সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের দলে প্রায় ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। ইমন ও রায়হান বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।








