রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

‘বাংলাদেশি পরিচয়ে গর্বিত, তবে আমি নিউহামের সবার মেয়র’

যুক্তরাজ্যের লন্ডনের নিউহাম কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন। তিনি নিউহামের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের মূলধারার কোনো বড় রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র হিসেবেও তিনি নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করেছেন।

গত ৭ মে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয়ভাবে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি বিভিন্ন এলাকায় ধাক্কা খেলেও নিউহামে দলটির প্রার্থী হিসেবে জয় পান ফরহাদ হোসেন। নির্বাচনে বিজয়ের পর নিজের রাজনৈতিক যাত্রা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

ফরহাদ হোসেন বলেন, ছোটবেলায় তার লক্ষ্য কখনো মেয়র হওয়া ছিল না। নিউহামে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিকের মূল লক্ষ্য ছিল সবসময় কমিউনিটির জন্য কাজ করা। একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে তার এই যাত্রা যুক্তরাজ্যের সুযোগ-সুবিধা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিফলন বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, কঠোর পরিশ্রম, কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জনসেবার প্রতি অঙ্গীকার থাকলে যে কেউ নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাতে পারেন। নিজের বাংলাদেশি শিকড় নিয়ে গর্বিত হলেও তিনি মনে করেন, মেয়র হিসেবে তার দায়িত্ব নিউহামের সব বাসিন্দার প্রতি সমান।

নিউহামের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র হওয়ার বিষয়টিকে তিনি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, এই অর্জন তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের পাশাপাশি অন্যান্য কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদেরও নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করবে।

তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে নিউহামের মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। তার ভাষায়, গর্বের বিষয় হলেও তার মূল লক্ষ্য হলো সবার মেয়র হিসেবে কাজ করা।

নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে ফরহাদ হোসেন বলেন, ভোটাররা শুধু রাজনৈতিক দল নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিগত অবস্থান ও মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, নিউহামের বাসিন্দারা জাতীয় রাজনীতির চেয়ে স্থানীয় সমস্যার সমাধানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, মানুষ আবাসন সংকট, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ সড়ক এবং উন্নত নাগরিক সেবার মতো বাস্তব বিষয়গুলোতে কার্যকর নেতৃত্ব চেয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল সেই প্রত্যাশারই প্রতিফলন।

এদিকে নিউহাম কাউন্সিলে লেবার পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলেও বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন নতুন মেয়র। তিনি বলেন, জনস্বার্থের বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১০০ দিনের জন্য তিনটি অগ্রাধিকারও নির্ধারণ করেছেন ফরহাদ হোসেন। এর মধ্যে রয়েছে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সেবা ও পরিচ্ছন্নতা উন্নয়ন, একটি ন্যায্য ও মানবিক পার্কিং নীতি বাস্তবায়ন এবং জননিরাপত্তা জোরদার করা।

তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি এসব বিষয়ই সামনে এনেছেন। তাই শুরুতেই এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবেন।

আবাসন খাত নিয়ে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আরও সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ এবং সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অসাধু বাড়িওয়ালা ও অতিরিক্ত জনাকীর্ণ আবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।

পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় অবৈধভাবে ময়লা ফেলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি পুলিশ ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।

নিউহামে বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস। তাদের উদ্দেশে ফরহাদ হোসেন বলেন, এই কমিউনিটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা, শিক্ষা, পরিবার ও জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। তিনি সবাইকে জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কমিউনিটি নেতৃত্বে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।

লন্ডনের আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমানের পুনর্নির্বাচনের প্রসঙ্গও উঠে আসে আলোচনায়। ফরহাদ হোসেন মনে করেন, লন্ডনের পাঁচটি নির্বাহী মেয়রশাসিত বরোর মধ্যে দুটিতে বাংলাদেশি নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি।

তার মতে, এটি শুধু একটি কমিউনিটির সাফল্য নয়, বরং যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্রকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে জনসেবায় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রাজনীতিকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ধরে রাখতে না পারার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে রাজনৈতিক প্রভাবও কমে যায়। তাই তিনি মানুষের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা, তাদের কথা শোনা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করাকেই রাজনৈতিক সফলতার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেন।

তরুণ ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, অল্প বয়স থেকেই জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী কাজ, কমিউনিটি সংগঠন এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি হয়।

আগামী পাঁচ বা দশ বছর পর মানুষ তাকে কীভাবে মনে রাখুক প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ হোসেন বলেন, তিনি চান মানুষ তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে স্মরণ করুক, যিনি নিউহামকে আরও পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও ঐক্যবদ্ধ একটি বরোতে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছেন।

তার মতে, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি নিউহামের মানুষের জন্য কাজ করতে চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *