টানা বর্ষণে কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে আটজন উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা এবং একজন কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারের ঘোনা এলাকার বাসিন্দা। অতিবৃষ্টির কারণে আরও পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
সোমবার ভোর চারটার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারের ঘোনা এলাকায় পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে আলী আকবর (৪৫)-এর বাড়ির ওপর। স্থানীয়রা উদ্ধার করে তাকে এবং পরিবারের আরও দুই সদস্যকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অপর দুই সদস্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম জানান, পাহাড়ধসের সময় একই পরিবারের তিনজন মাটিচাপা পড়েছিলেন। পরে আশপাশের লোকজন দ্রুত উদ্ধারকাজে অংশ নেন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী আলী আকবরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এর আগে, রোববার দিবাগত রাত ১টা থেকে ভোর ৩টার মধ্যে উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ আটজনের মৃত্যু হয়।
রোহিঙ্গা নেতা আকতার কামাল জানান, রাত দেড়টার দিকে জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ধসে কামাল হোসাইনের বসতঘর মাটির নিচে চাপা পড়ে। এতে ঘুমন্ত অবস্থায় কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন। একই ঘটনায় পরিবারের আরও দুজন আহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন।
রাত দুইটার দিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-৭) ডি-৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে রশিদ উল্লাহর সাত বছর বয়সী ছেলে মো. একরামের মৃত্যু হয়।
এদিকে রাত সাড়ে তিনটার দিকে বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১১) সি-১১ ব্লকে পৃথক পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন নিহত হন। তারা হলেন উম্মে হাবিবা (২৭), তার বোন তানজিনা আক্তার (১৩), ভাই হারুনুর রশিদ (৩) এবং মোহাম্মদ রিহান (৫)। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ফায়ার সার্ভিস ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অতিভারী বৃষ্টির কারণে আশ্রয়শিবিরে আরও পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
আশ্রয়শিবিরে দায়িত্ব পালনকারী প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ৩৪টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে ৩৩টি শিবিরে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার মানুষ ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুর থেকে কক্সবাজারে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।








