বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

ভিএআর বিতর্কে বিভক্ত বিশেষজ্ঞরা, মিসরের বাতিল গোল নিয়ে মতভেদ; আর্জেন্টিনার গোলে রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ৩-২ গোলে হারের পর শুধু মিসরই নয়, রেফারিং বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ম্যাচের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, মিসরের বাতিল হওয়া গোল এবং আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে পেনাল্টির দাবি নাকচ করা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক আন্তর্জাতিক রেফারিরা।

মিসরের কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেছেন, ৬২ মিনিটে মোস্তাফা জিকোর করা গোলটি অন্যায্যভাবে বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে ফাউলের অভিযোগও আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এমনকি আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে রাখতেই এমন সিদ্ধান্ত এসেছে বলেও মন্তব্য করেন মিসর কোচ। অন্যদিকে ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকো রেফারিকে ‘জালিম’ বলে আখ্যা দেন।

তবে বিতর্কিত দুটি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় একমত নন ফুটবলের রেফারিং বিশ্লেষকেরাও।

ক্রীড়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএনের বিশ্লেষণে সাবেক ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ রেফারি ও সাবেক ভিএআর কর্মকর্তা অ্যান্ডি ডেভিস বলেন, মিসরের গোল বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়মসম্মত ছিল। তার ব্যাখ্যায়, গোল হওয়ার আগে আক্রমণের শুরুতে মিসরের ডিফেন্ডার মারওয়ান আত্তিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের জার্সি টেনে ধরেন এবং একই সঙ্গে তার পায়ের ওপর পা রাখেন। ভিএআর সেই ঘটনাকে ফাউল হিসেবে শনাক্ত করে মাঠের রেফারিকে মনিটরে গিয়ে পুনরায় দেখতে বলে। ভিডিও পর্যালোচনার পর রেফারি গোল বাতিল করেন।

ডেভিসের মতে, আত্তিয়ার ওই ফাউলের কারণেই আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং সেই একই আক্রমণ থেকে মিসর গোল করে। তাই ঘটনাটি মাঠের অনেক দূরে ঘটলেও, যেহেতু একই আক্রমণপর্বের ধারাবাহিকতায় গোল এসেছে, সে কারণে ভিএআরের হস্তক্ষেপ এবং গোল বাতিল, দুটিই সঠিক সিদ্ধান্ত।

ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মিসর দুটি ঘটনায় পেনাল্টির আবেদন জানায়। প্রথম ঘটনায় আর্জেন্টিনার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারকে হামদি ফাতির জার্সি টানতে দেখা যায়। পরে মোহাম্মদ সালাহ অভিযোগ করেন, পেনাল্টি এলাকায় ঢোকার সময় হুলিয়ান আলভারেস তাকে ফাউল করেছেন। তবে দুটি ক্ষেত্রেই মাঠের রেফারি খেলা চালিয়ে যেতে বলেন এবং ভিএআরও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

ডেভিসের মতে, ম্যাক আলিস্টারের জার্সি ধরা খুব অল্প সময়ের জন্য হয়েছিল এবং তা হামদি ফাতির খেলার সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেনি। একইভাবে সালাহর ঘটনাতেও তিনি স্পষ্ট ফাউল দেখেননি। তার ভাষ্য, দুই খেলোয়াড়ের বুটে স্বাভাবিক সংস্পর্শ হয়েছিল, যা খেলার গতির ফল; বরং সালাহ পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা করেছেন।

তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সাবেক রেফারি গ্রাহাম স্কট। দ্য অ্যাথলেটিকে প্রকাশিত তার বিশ্লেষণে তিনি বলেন, জিকোর গোল বাতিল করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তার মতে, আত্তিয়া ও মার্তিনেজের মধ্যে যে শারীরিক লড়াই হয়েছিল, তা স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংস্পর্শের মধ্যেই পড়ে। ঘটনাটি গোলপোস্ট থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ঘটেছিল এবং এরপর আর্জেন্টিনার রক্ষণ পুনর্গঠনের যথেষ্ট সময় ছিল। তাই ভিএআরের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল না।

স্কটের মতে, প্রতিটি গোলের আগে আক্রমণের ধাপগুলো ভিএআর পর্যালোচনা করতে পারে ঠিকই, কিন্তু গোল বাতিল করতে হলে সেখানে স্পষ্ট ও গুরুতর ফাউল থাকতে হয়। তার মূল্যায়নে, আত্তিয়ার চ্যালেঞ্জ সেই মানদণ্ড পূরণ করেনি। তবে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে সালাহর পেনাল্টির দাবি নাকচ করাকে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন। তার ভাষায়, সামান্য সংস্পর্শ হলেও তা ফাউল হওয়ার মতো পর্যায়ে ছিল না।

একই ধরনের মত দিয়েছেন সাবেক ফিফা রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গও। ফক্স স্পোর্টসকে তিনি বলেন, আত্তিয়ার ঘটনাকে ফাউল হিসেবে দেখার সুযোগ থাকলেও সেটি ভিএআরের হস্তক্ষেপের মতো স্পষ্ট ভুল ছিল না। তার মতে, মাঠের রেফারি যখন গোলের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তখন ভিএআরের সেই সিদ্ধান্ত বদলানো উচিত হয়নি।

ক্ল্যাটেনবার্গ আরও বলেন, চলতি বিশ্বকাপে রেফারিরা শারীরিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ছাড় দিচ্ছেন। সেই ধারাবাহিকতা বিবেচনায় আত্তিয়ার চ্যালেঞ্জকে ফাউল বলা কঠিন। তার অভিযোগ, ভিএআর এই ঘটনায় অতিরিক্ত খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেছে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, ম্যাচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষেই গেছে এবং বিশ্বজুড়ে অনেক সমর্থক এটিকে ভিএআরের অন্যায্য হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখবেন।

তবে ফক্স স্পোর্টসের ফুটবল রেফারিং বিশ্লেষক ড. জো মাচনিক ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ভিএআর প্রটোকল অনুযায়ী যদি কোনো আক্রমণের সূচনায় ফাউলের মাধ্যমে বলের দখল অর্জিত হয় এবং প্রতিপক্ষ নতুন করে বলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পায়, তাহলে সেই আক্রমণ থেকে হওয়া গোল বৈধ হতে পারে না। ফাউলটি গোলের কত সেকেন্ড আগে বা কত গজ দূরে ঘটেছে, নিয়মে তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। তাই তার মতে, মিসরের গোল বাতিল করা পুরোপুরি আইএফএবির নিয়ম অনুসারেই হয়েছে।

আইএফএবির ভিএআর প্রটোকলেও বলা হয়েছে, গোল হওয়ার আগে আক্রমণকারী দল যদি ফাউল, অফসাইড, হ্যান্ডবল বা অন্য কোনো নিয়মভঙ্গ করে থাকে, তাহলে সেই ঘটনাটি রিভিউ করার ক্ষমতা ভিএআরের রয়েছে। এই বিধানকেই সামনে রেখে এক পক্ষ গোল বাতিলকে নিয়মসম্মত বলছে, অন্য পক্ষ মনে করছে, ঘটনাটি ভিএআরের হস্তক্ষেপের মতো স্পষ্ট ভুল ছিল না।

ফলে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের দুটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক এখন আর শুধু দুই দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ফুটবলের আইন ব্যাখ্যা ও ভিএআরের প্রয়োগ নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *