পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার আশায় সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর পৌরসভার পশ্চিম ধুলজুরী গ্রামের বাসিন্দা রাসেল মিয়া। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কর্মস্থলে বজ্রপাতে প্রাণ হারান তিনি। চার মাস পেরিয়ে গেলেও একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানোর শোক আর আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি তার পরিবার। স্ত্রী শাহনাজ আক্তার এখন চার সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ মার্চ সৌদি আরবে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে রাসেল মিয়ার মৃত্যু হয়। খবরটি দেশে পৌঁছানোর পর পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে স্ত্রী ও চার সন্তান ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
ঘটনার পর হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী নাহিদ ইভা রাসেলের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। তিনি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন। পরে প্রায় এক মাস পর রাসেলের মরদেহ দেশে আনা হয়।
তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রাথমিক সহায়তার পর গত চার মাসে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা মেলেনি। ফলে সংসারের দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানদের পড়াশোনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাসেলের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ। স্বামীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে মারা যান তার মা। পরপর দুই স্বজনকে হারিয়ে মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি।
রাসেলের বৃদ্ধ মা মোমেনা আক্তার বলেন, অভাবের কারণে অনেক দিন তিন বেলার বদলে একবেলা খেয়ে থাকতে হয়। নাতি-নাতনিদের পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো তো দূরের কথা, ঠিকমতো খাবারের ব্যবস্থাও করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহনাজ আক্তার বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর প্রথমদিকে অনেকেই খোঁজ নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন আর কেউ আসেন না। গলায় অপারেশন হওয়ায় তিনিও অসুস্থ। চার সন্তানকে নিয়ে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তিনি সরকার, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং মানবিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রতিবেশী আবু রায়হান বলেন, রাসেল মিয়ার পরিবার এখন গভীর মানবিক সংকটে রয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মিসবাহ উদ্দিন মানিক বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চারটি শিশু আজ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী নাহিদ ইভা জানান, প্রবাসীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হয় এবং প্রাথমিক সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়া মৃতের স্ত্রীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বসতঘর মেরামতের জন্য ঢেউটিন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তিনি সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারেন।








