কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে তনুর পোশাক থেকে পাওয়া ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর আগে একই মামলায় আরও তিনজনের ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
গত ১৬ জুলাই কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-১ আমলি আদালতের বিচারক মো. মুমিনুল হক এ আদেশ দেন। বিষয়টি মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আদালতের নির্দেশে যাদের ডিএনএ পরীক্ষা হবে, তারা হলেন সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার মেঘাই গ্রামের বাসিন্দা সাবেক সেনাসদস্য জাহিদুল ইসলাম এবং কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার লক্ষ্মীনগর-রাজাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ (রাব্বী)। তাদের মধ্যে জাহিদুল ইসলাম তনু হত্যাকাণ্ডের সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। তনুর পরিবার শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে এলেও এতদিন মামলার নথিতে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অন্যদিকে ফয়সাল আহমেদ সেনাবাহিনীর বাইরের ব্যক্তি বলে জানা গেছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম সন্দেহভাজন এই দুই ব্যক্তির রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষা করার অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন।
আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ভিকটিমের জব্দ করা পোশাকের ডিএনএ বিশ্লেষণে একাধিক পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। সেই প্রোফাইলের সঙ্গে সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদের ডিএনএ মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বলেন, আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তি সুষ্ঠু তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভিকটিমের পোশাক থেকে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে সন্দেহভাজনদের নমুনা তুলনা করা গেলে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আদেশে আদালত আরও উল্লেখ করেন, এটি একটি বহুল আলোচিত হত্যা মামলা এবং এখনো প্রকৃত অভিযুক্তদের পরিচয় নিশ্চিত হয়নি। তাই নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করতে সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল প্রস্তুত ও তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হলো।
মঙ্গলবার বিকেলে এ বিষয়ে পিবিআই পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। তিনি জানান, মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
এর আগে, গত ৬ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে তিনজনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার আবেদন করলে আদালত তা অনুমোদন করেন। তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন কুমিল্লা আদালতে হাজির করার আগে ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
ওই তালিকার অন্য দুই ব্যক্তি ছিলেন ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ এবং সৈনিক শাহীন আলম। গত ৮ জুন কুমিল্লার আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারিরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন সোহাগী জাহান তনু। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসসংলগ্ন ঝোপ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পরদিন তনুর বাবা, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের তৎকালীন অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।








