সরকারি ব্যয় কমানো এবং পুলিশের জনবল ও যানবাহনের ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৮ জন মন্ত্রীর চলাচলে দেওয়া পুলিশের মুভমেন্ট এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নিজের নিরাপত্তা বহর কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সরকার ও পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ইতোমধ্যে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। ফলে এখন সীমিতসংখ্যক রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছাড়া অন্য মন্ত্রীরা ঢাকার ভেতরে চলাচলের সময় আর পুলিশের এসকর্ট সুবিধা পাচ্ছেন না।
মন্ত্রিসভার একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি পুলিশের যানবাহন ও জনবলের সংকট বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সূত্রটির দাবি, কয়েকজন মন্ত্রী নিজেরাই এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছিলেন।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমে নিজের নিরাপত্তা প্রটোকল কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। আগে তার গাড়িবহরের সঙ্গে চারটি এসকর্ট যান থাকলেও এখন তা কমিয়ে দুটি করা হয়েছে। এরপর যেসব মন্ত্রীর ক্ষেত্রে এসকর্ট অপরিহার্য নয় বলে মনে হয়েছে, তাদের সুবিধা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন তিনি। সেই নির্দেশনার পর গত সপ্তাহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ডিএমপিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখন থেকে শুধু প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই মুভমেন্ট এসকর্ট দেওয়া হবে।
বর্তমানে যাদের জন্য এই সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং মন্ত্রী পদমর্যাদার পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপও এসকর্ট সুবিধা পাচ্ছেন।
ডিএমপি সূত্র বলছে, এই সিদ্ধান্ত কেবল রাজধানীর ভেতরে চলাচলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মন্ত্রীরা সরকারি সফরে ঢাকার বাইরে গেলে আগের মতোই গানম্যান, হাউস গার্ড এবং পুলিশের অন্যান্য নিরাপত্তাসুবিধা পাবেন।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এই ১৮ জন মন্ত্রী ঢাকায় পুলিশের মুভমেন্ট এসকর্ট ব্যবহার করছিলেন। বর্তমানে মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ২৪ জন মন্ত্রী এবং ২৫ জন প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা রয়েছেন।
সাধারণভাবে একজন মন্ত্রীর এসকর্ট দলে একজন উপপরিদর্শক (এসআই), চারজন কনস্টেবল এবং পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান থাকে। এসব সদস্যের বেতন-ভাতা ও যানবাহনের ব্যয় সরকার বহন করে।
যেসব মন্ত্রীর এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে তারা হলেন, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, কৃষি ও মৎস্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকীর মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং অন্যান্য ভিআইপির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও চলাচল নিশ্চিত করতে ঢাকায় বর্তমানে ১ হাজার ৬৯১ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একজন ভিআইপির বাসভবনে পালাক্রমে চারজন পুলিশ সদস্য, কার্যালয়ে একজন এবং গাড়িবহরের সঙ্গে পাঁচজন সদস্য নিয়োজিত থাকেন। পাশাপাশি স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) থেকে একজন গানম্যানও দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বিরোধীদলীয় নেতা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ভিআইপি তালিকায় রয়েছেন। এছাড়া সরকারি গেজেটের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তিদেরও ভিআইপি মর্যাদা দেওয়া যেতে পারে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও ভিআইপি মর্যাদা পাচ্ছেন। তার নিরাপত্তায় বর্তমানে পাঁচজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।








