শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক জোটে বাংলাদেশের যোগদান, কৌশলগত যত সুবিধা

সৌদি আরবের উদ্যোগে গঠিত নতুন ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সে’ (বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট) বাংলাদেশের যোগদানকে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল। সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, বর্তমান প্রশাসনের ‘Bangladesh First’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনায় জাতীয় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

গত ৩০ জুলাই সৌদি আরব আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে বহুজাতিক এই সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নিরাপদ সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যায়, যার বড় একটি অংশবাহী জাহাজ সুয়েজ খাল ও বাব-আল-মানদেব প্রণালী ব্যবহার করে। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে জলদস্যুতা, সশস্ত্র হামলা এবং বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যেই এই জোট গঠন করা হয়েছে। ১৪টি দেশ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব পথ ভারত মহাসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা কৌশলগত সামুদ্রিক করিডরের অংশ।

বিশ্লেষকদের ধারণা, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এবং ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিই সৌদি আরবকে এমন একটি জোট গঠনে উৎসাহিত করেছে। বিশ্বে তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই রুটে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতিমালার আলোকে দায়িত্বশীল সামুদ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এই জোটে অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ জোটে যুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তা বাড়বে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের সময় ও পরিবহন ব্যয় কমতে পারে। দীর্ঘ বিকল্প সমুদ্রপথ ব্যবহার করার প্রয়োজনও কমে আসবে। এর ফলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল আরও স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা। অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতেও নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

নিরাপদ সমুদ্রপথ নিশ্চিত হলে পরিবহন ব্যয় ও জাহাজের বীমা খরচ কমবে, জ্বালানি সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে এবং আমদানি ব্যয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে অতিরিক্ত ফ্রেইট চার্জ কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এ জোটকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক টাস্কফোর্সে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী বাস্তব আভিযানিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমুদ্র অভিযান, কনভয় এসকর্ট, সমন্বিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম এবং আন্তঃবাহিনীর সমন্বয় আরও শক্তিশালী হতে পারে।

এ ছাড়া মেরিটাইম ডোমেইন সচেতনতা, স্যাটেলাইট নজরদারি, ইউএভি পরিচালনা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামুদ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সার্বিকভাবে, বাব-আল-মানদেব প্রণালীসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন এ জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ সামুদ্রিক যোগাযোগ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি সরকারের ঘোষিত ‘Bangladesh First’ নীতির বাস্তব প্রয়োগেরও একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *