সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

লিবিয়ায় জিম্মি করে শত কোটি টাকার মুক্তিপণ আদায়, দেশে বিলাসবহুল সম্পদের সাম্রাজ্য

ইতালিতে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় পাচার, সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায়ের ভয়াবহ অপরাধের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, গত পাঁচ বছরে এই চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের আলাউদ্দিন শেখ। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন একই এলাকার আওয়াল ফরাজীসহ আরও অনেকে। তাদের বিরুদ্ধে গত ১৩ এপ্রিল সিআইডি ৩৪ জনকে আসামি করে মামলা করেছে। তদন্তে জানা গেছে, চক্রটির সদস্যরা দেশের অন্তত ১১ জেলায় সক্রিয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

সিআইডির তথ্যমতে, বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের প্রথমে লিবিয়ায় পাঠানো হতো। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের জিম্মি করে শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। সেই নির্যাতনের ভিডিও দেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা ছিল চক্রটির প্রধান কৌশল। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে অর্থ দেশে আনতে হুন্ডি নেটওয়ার্কও ব্যবহার করা হতো।

নড়াইলের সাতবাড়িয়া বাজারে আলাউদ্দিন শেখের দোতলা বাড়ি এখন স্থানীয়দের নজর কাড়ে। বাড়ির চারপাশে উঁচু প্রাচীর, প্রবেশপথে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং পাশেই রয়েছে গরুর খামার। আরও একটি বড় খামার নির্মাণাধীন। পরিবারের দাবি, আলাউদ্দিন লিবিয়ায় ঠিকাদারি করে এসব সম্পদ গড়েছেন। তার বাবা আলী শেখ বলেন, ছেলে বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই তাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তবে ব্যাংক হিসাবে বিদেশ থেকে আসা অর্থের বিষয়ে তিনি স্বীকার করেন, একসময় তার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও তিনি দাবি করেন, কয়েক বছর ধরে এসব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

অন্যদিকে, একই গ্রামের আওয়াল ফরাজীরও রয়েছে দৃষ্টিনন্দন দোতলা বাড়ি। তার মা হারিচা বেগমের ভাষ্য, ছেলে আগে বিদেশে লোক পাঠানোর কাজ করলেও এখন আর সেই ব্যবসার সঙ্গে নেই। তবে তদন্তের তথ্য বলছে, ভাই গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই আওয়াল আত্মগোপনে রয়েছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আলাউদ্দিন প্রায় ১২ বছর আগে লিবিয়ায় যান। পরে আওয়াল ফরাজীর সঙ্গে মিলে মানব পাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। লিবিয়ায় ভুক্তভোগীদের আটকে রাখা, নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় এবং দেশের সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বও তিনি পালন করতেন।

সিআইডির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মুক্তিপণের অর্থ লুকাতে চক্রটি অন্তত ১১৪টি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেছে। শুধু চক্রের সদস্যরাই নন, তাদের স্বজন, পরিচিত ব্যক্তি, এমনকি গৃহিণী, মুদিদোকানি ও ওষুধের দোকানমালিকদের অ্যাকাউন্টেও কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। প্রতি লাখ টাকার বিপরীতে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা কমিশনের বিনিময়ে এসব হিসাব ব্যবহার করা হতো।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, নড়াইলের ‘শুকুর মেডিকেল হল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে গত দুই বছরে প্রায় দুই কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। সিআইডির দাবি, মানব পাচার, মুক্তিপণ আদায় ও হুন্ডি অপরাধ একই আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।

এই চক্রের প্রতারণার শিকার হয়েছেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের আমেনা বেগমও। ছেলে, মেয়ে ও দুই নাতিসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালি পাঠানোর আশায় তিনি প্রতিজনের জন্য ১৮ লাখ টাকা হিসেবে মোট ৯০ লাখ টাকার চুক্তি করেন। জমি বিক্রি ও ঋণ করে অর্থ জোগাড় করলেও তাদের ইতালির পরিবর্তে নেওয়া হয় লিবিয়ায়। পরে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে আরও অর্থ দাবি করা হয়। আমেনা বেগম জানান, চক্রের সদস্য মিনা বেগম, নুরুল ইসলাম ও মুরাদ মিয়ার ব্যাংক হিসাবে তিনি ৭৫ লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর তাঁদের নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পাঠানো হয়।

সিআইডি জানিয়েছে, এই মানব পাচারকারী নেটওয়ার্কের সদস্যরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, মাদারীপুর, কুমিল্লা, খুলনা, কিশোরগঞ্জ, রংপুর, চট্টগ্রাম, নড়াইল, যশোর, নীলফামারী, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষ সংগ্রহ করাই ছিল তাদের মূল কাজ। পরে লিবিয়ায় আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করতেন।

তদন্তে আরও জানা গেছে, হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশি অর্থ দেশে এনে একই ব্যাংক হিসাব দিয়ে মুক্তিপণ ও হুন্ডির টাকা লেনদেন করা হতো। এ ঘটনায় জড়িত ১৮টি নামসর্বস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করেছে সিআইডি। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশে থাকা সহযোগীদের বিষয়ে অনুসন্ধান শেষ হলে আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা সামনে আসবে।

অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অর্ধশতাধিক মানব পাচারকারী চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন জানিয়েছেন, চক্রটির সদস্যদের সম্পদের উৎস ও পরিমাণ নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।

এদিকে, ব্র্যাকের এক গবেষণায় লিবিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার চিত্র উঠে এসেছে। লিবিয়া থেকে দেশে ফেরা ৫৫৭ জনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ ভালো চাকরির আশ্বাস পেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছে ৮৯ শতাংশ কোনো কাজ পাননি। ৬৩ শতাংশ পথেই বন্দী হন এবং বন্দীদের ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। তাদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৬৮ শতাংশ মুক্তভাবে চলাচলের স্বাধীনতা হারান। খাদ্যসংকটও ছিল প্রকট, ৫৪ শতাংশ দিনে তিন বেলা খাবার পাননি, আর ২২ শতাংশ দিনে মাত্র একবার খাবার পেয়েছেন।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, লিবিয়ায় শতাধিক ক্যাম্পে বাংলাদেশিসহ অভিবাসীদের জিম্মি করে নির্যাতন চালানো হয়। এসব ঘটনায় পরিবারগুলোর কাছ থেকে ৫ লাখ থেকে ৭৬ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে। তার মতে, শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না, তাদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদও বাজেয়াপ্ত করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *