ইরানের তিন পাইলটকে ছয় মাস ধরে আটক করে রাখার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে কাতার। দোহা বলছে, গত মার্চে কাতারের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ইরানি যুদ্ধবিমানকে সতর্ক করার পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে কাতারি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিযানে দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একাধিক পোস্টে এসব তথ্য জানান। তার ভাষ্য, জীবিত কোনো ইরানি পাইলট বা ক্রুকে কাতারি কর্তৃপক্ষ আটক করে রাখেনি।
মাজেদ বলেন, ইরানি পাইলটদের আটকের বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া দাবিতে কাতার বিস্মিত। বিশেষ করে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে যখন কূটনৈতিক উদ্যোগ চলছে, তখন এ ধরনের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
কাতারের দাবি অনুযায়ী, মার্চে একাধিক ইরানি যুদ্ধবিমান অনুমতি ছাড়াই তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে। কাতারি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী যোগাযোগ করে বিমানগুলোকে সতর্ক করার চেষ্টা করলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এরপর যুদ্ধবিমানগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়।
ঘটনার পর কাতারের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এক ইরানি পাইলটের মরদেহ উদ্ধার করে। তার নাম মাজিদ কাজেমি বলে জানানো হয়েছে। মরদেহ ইরানে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন কাতারের কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে কাতারের বক্তব্যের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরজাদেহ আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে দাবি করেছেন, মার্চে এসইউ-২৪ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর তিন পাইলট জীবিত অবস্থায় কাতারের হাতে আটক হন।
ওই তিন পাইলট হলেন জাভেদ সালেহি, আবদোলমাজিদ দাশতিয়ান ও ওমরান বেহরাভেশিয়ান। ইরানের অভিযোগ, তাদের প্রায় ছয় মাস ধরে আটকে রাখা হয়েছে এবং পরিবার বা কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও দেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবিক হস্তক্ষেপ চেয়েছে তেহরান।
তবে কাতার বলছে, ইরানের অভিযোগের পক্ষে কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। মাজেদ আল-আনসারির ভাষ্য, কাতার এপ্রিল মাসে একটি ইরানি দলকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য দোহায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু এখনো সেই আমন্ত্রণে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি ঘটে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত এই ঘাঁটিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সদস্যরা অবস্থান করেন। মার্চের শুরুতে কাতার জানিয়েছিল, তারা দুটি ইরানি সুখোই সু-২৪ বোমারু বিমান ভূপাতিত করেছে।
ওই সময় উপসাগরীয় কোনো দেশের পক্ষ থেকে ইরানি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘোষণা ছিল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর তেহরানও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়। এরপর উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের বিস্তার ঘটে।
এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি হলেও জুনে শান্তি কাঠামো নিয়ে আলোচনা ভেঙে যায়। এর পর হরমুজ প্রণালির আশপাশে নতুন করে সংঘর্ষ, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বিভিন্ন অবকাঠামোয় হামলার ঘটনা সামনে আসে।
এমন পরিস্থিতিতেও কাতার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ধরে রেখেছে। ফলে ইরানি পাইলটদের আটকের অভিযোগ ঘিরে দোহা ও তেহরানের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য শুধু একটি সামরিক ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ নয়, বরং চলমান আঞ্চলিক কূটনীতিতেও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।








