মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

পাকা ঘরের স্বপ্ন পূরণ হলো না, যুক্তরাষ্ট্রে গুলিতে প্রাণ গেল রাজুর

বাড়ির ভাঙাচোরা টিনের ঘরটি একদিন পাকা হবে, সেই স্বপ্নই ছিল মো. রাজুর (৩৮)। বিদেশে গিয়ে আয় করে পরিবারের অভাব ঘোচাবেন, মেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন প্রবাসে। সাত বছর কাতারে থেকেও তেমন সচ্ছলতা ফেরাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে অবৈধ পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে।

কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে বন্দুকধারীর গুলিতে প্রাণ হারালেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর এই যুবক। তার মৃত্যুতে পরিবারের একমাত্র ভরসার জায়গাটি যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে।

রাজুর বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কংশনগর গ্রামের পাইক বাড়িতে। গত শনিবার রাতে ব্রুকলিনের একটি পিৎজার দোকানে কর্মরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরদিন রোববার তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

বিদেশে যাওয়া, কিন্তু ভাগ্য বদলাল না
রাজু দেশে থাকাকালে রংমিস্ত্রির কাজ করতেন। বড় মেয়ে জান্নাতুল নাইমার জন্মের পর পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় কাতারে যান তিনি। সেখানে কাটান প্রায় সাত বছর।

তবে দীর্ঘ সময় প্রবাসে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সঞ্চয় করতে পারেননি। ২০২৩ সালে কাতার থেকে দেশে ফেরেন। একই বছরের শেষ দিকে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।

পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন রাজু। জীবনের শেষদিকে নিউইয়র্কের ওই পিৎজার দোকানে চাকরি নেন।

দোকানে কাজের সময় গুলি
যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরিবার জানিয়েছে, শনিবার রাতে দোকানে কাজ করছিলেন রাজু। তখন এক বন্দুকধারী সেখানে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে রাজুসহ আরও একজন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হন।

পরে রাজুকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাজুর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই তার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

দুই মেয়েকে রেখে গেলেন রাজু
রাজুর পরিবারের সদস্য তিন ভাই ও তিন বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার স্ত্রী পলি আক্তার এবং দুই মেয়ে ১২ বছরের জান্নাতুল নাইমা ও আড়াই বছরের রাইসা আক্তার।

সোমবার দুপুরে কংশনগর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ঘরের ভেতর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন রাজুর স্ত্রী, দুই মেয়ে, বাবা মোহাম্মদ উল্যাহসহ পরিবারের সদস্যরা। তাদের সান্ত্বনা দিতে এসে আবেগ ধরে রাখতে পারছেন না প্রতিবেশীরাও।

বাবার আকুতি, ‘ছেলেকে শেষবার দেখতে চাই’
রাজুর বাবা মোহাম্মদ উল্যাহ বলেন, ছেলের জীবনটা কেটেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পরিবারের জন্য কিছু করার আশায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরও তার আশা ছিল এবার হয়তো পরিস্থিতি বদলাবে।

ছেলেকে নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথাও বলেন তিনি। তার আশা ছিল, রাজু প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাড়ির টিনের ঘরটি পাকা করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

মোহাম্মদ উল্যাহ বলেন, ‘ছেলেটা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করেছে। অনেক কষ্টের বিনিময়ে আমেরিকায় গেছে। তাকে নিয়ে আমারও অনেক আশা ছিল। ছেলেটা প্রতিষ্ঠিত হবে, টিনের ঘরটি পাকা করবে, কত আশা, সব শেষ হয়ে গেছে। আমি আমার ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে চাই। সরকার যেন সেই ব্যবস্থাটুকু করে।’

‘স্বপ্ন পূরণের আগেই মৃত্যু’
আমিশাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল আজিজ বলেন, রাজু জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছেন। সাত বছর কাতারে থেকেও তেমন কিছু করতে পারেননি। দেশে তার বসতঘরও এখনো জরাজীর্ণ।

তিনি বলেন, ‘শেষে নিজের সহায়-সম্বল বিক্রি করে স্বপ্নপূরণের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তার মৃত্যু হলো।’

একটি পাকা ঘর, পরিবারের জন্য একটু স্বচ্ছল জীবন আর মেয়েদের ভবিষ্যৎ কয়েকটি স্বপ্ন নিয়েই দেশ ছেড়েছিলেন রাজু। প্রবাসের কঠিন পথ পেরিয়েও সেই স্বপ্নের কাছাকাছি যেতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত দূরদেশের একটি কর্মস্থলে গুলিতে থেমে গেল তার জীবনসংগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *