মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

সবশেষ

ইরানের সস্তা ড্রোনের মোকাবিলায় ৫ হাজার ডলারের ‘গার্ডিয়ান’, কতটা কার্যকর হবে

ইরানের ড্রোন হামলা ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্যে এখন বড় প্রশ্ন শুধু কত শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা যায়, তা নয়, কত কম খরচে তা করা সম্ভব। সেই হিসাব সামনে রেখেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) উৎপাদন শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান পাওয়ারাস। তাদের তৈরি ‘গার্ডিয়ান’ নামের একটি প্রতিরক্ষা ড্রোনের দাম প্রায় ৫ হাজার ডলার।

ছোট আকারের এই ড্রোনের লক্ষ্য আকাশপথে আসা মাঝারি আকারের শত্রু ড্রোনকে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস করা। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০০ মাইল গতিতে উড়তে পারে গার্ডিয়ান। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর সক্ষমতা এর নেই।

যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে অস্ত্র তৈরির হিসাব
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে আরও দ্রুত এগোচ্ছে। এর একটি বড় কারণ ইরানের ব্যাপক ড্রোন হামলা।

এ পর্যন্ত ইউএইর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরান ৫০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এসব হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত ও শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। একটি তেল শোধনাগার বন্ধ হয়ে গেছে এবং অ্যামাজনের দুটি তথ্যকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুত কমে আসায় স্থানীয়ভাবে দ্রুত অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে পাওয়ারাস।

স্থানীয় কারখানায় দিনে ৩০টি ড্রোন
ইউএইতে গত মাসে উৎপাদন শুরু করা কারখানাটিতে শ্রমিকেরা প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছেন। ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জুড়ে সেখানে প্রতিরক্ষা ড্রোন বানানো হচ্ছে।

কারখানাটিতে এখন প্রতিদিন প্রায় ৩০টি ড্রোন তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন দ্রুত বাড়িয়ে শিগগিরই দৈনিক ১০০টি ড্রোন তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

কারখানাটির কর্মীদের বেশির ভাগই ফিলিপাইন ও চীনের নাগরিক। তবে পাওয়ারাস ইউএইর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা তাদের গ্রাহকের পরিচয় প্রকাশ করেনি।

পাওয়ারাসের মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে মাসে প্রায় ৩ হাজার প্রতিরক্ষা ড্রোন তৈরি হচ্ছে। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বজুড়ে কারখানার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে মাসে ১৫ হাজার ড্রোন উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

‘লেগোর’ মতো জোড়া লাগানো যায়
গার্ডিয়ান তৈরির ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রতিরক্ষা শিল্পের জটিল উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বদলে সহজ ও দ্রুত সংযোজনের ওপর জোর দিয়েছে পাওয়ারাস।

ড্রোনটির বিভিন্ন অংশ অনেকটা লেগোর মতো জোড়া লাগানো যায়। এতে বাজারে সহজলভ্য ক্ষুদ্র চিপ ও বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত ইউক্রেনের একটি নকশার ভিত্তিতে গার্ডিয়ান তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

পাওয়ারাস ইউএইর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যার দিয়েছে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের একজন গ্রাহকের জন্য দ্রুত ড্রোন সংযোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বিপণন বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল সিনেনস্কি।

৫ হাজার ডলারের ড্রোন বনাম লাখ ডলারের প্রতিরক্ষা
গার্ডিয়ানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর দাম। একটি ড্রোনের মূল্য প্রায় ৫ হাজার ডলার। একই দামের কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বীও রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার টরেন্সভিত্তিক নেরোসের ‘ব্যান্ডিট’ প্রতিরক্ষা ড্রোনের সবচেয়ে সাধারণ মডেলের দামও প্রায় ৫ হাজার ডলার।

অন্যদিকে প্রতিরক্ষা খাতের আরও ব্যয়বহুল ব্যবস্থার সঙ্গে এই দামের পার্থ্য বিশাল। যুক্তরাষ্ট্রের রেথিয়নের ‘কায়োট’ প্রতিরক্ষা ড্রোনের আনুমানিক দাম ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ ডলার।

আবার লকহিড মার্টিনের পিএসি-৩-এর মতো ব্যবস্থা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার জন্য তৈরি। ফলে ৫ হাজার ডলারের গার্ডিয়ানকে তার সরাসরি বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বড় অস্ত্র নির্মাতারাও কম খরচের পথে
দ্রুত অস্ত্র সরবরাহের চাপের মুখে বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে।

লকহিড মার্টিন গত জুলাইয়ে জানিয়েছে, ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইউরোপেই কম খরচের একটি প্রতিরক্ষা ড্রোন তৈরি করবে তারা। এর সম্ভাব্য দাম প্রায় ২০ লাখ ডলার-পিএসি-৩ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রায় অর্ধেক। তবে নতুন অস্ত্রটির পরীক্ষা ২০২৮ সালের আগে হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউএইতে পাওয়ারাসই একমাত্র মার্কিন প্রতিষ্ঠান নয় যারা প্রতিরক্ষা ড্রোন তৈরি করছে। রেথিয়ন গত অক্টোবরে সেখানে তাদের ‘কায়োট’ প্রতিরক্ষা ড্রোন উৎপাদনে অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছে।

অন্যদিকে পাওয়ারাস গত সপ্তাহে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো সুরক্ষায় তারা ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে। ভারতের মুম্বাইয়ের কাছেও একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সস্তা ড্রোন কি সব হুমকি ঠেকাতে পারবে?
এখানেই গার্ডিয়ানের সীমাবদ্ধতা। এটি মূলত মাঝারি আকারের ড্রোন মোকাবিলার জন্য তৈরি। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারে না। ফলে ইরানের হামলার পুরো চিত্র বিবেচনায় নিলে শুধু এ ধরনের কম খরচের প্রতিরক্ষা ড্রোন দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচির পরিচালক স্টেসি পেটিজনের মতে, গার্ডিয়ান ও পিএসি-৩ পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং একে অন্যের পরিপূরক।

তার আশঙ্কা, ইরান নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আবার বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার কাছ থেকে জেরান-৩ পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এগুলো জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ ড্রোন, যা আগের সংস্করণের তুলনায় দ্রুতগতির।

পেটিজনের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়া যেভাবে ব্যাপকভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, ইরানও সেদিকেই এগোতে পারে। তাই ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় একসঙ্গে কম খরচের ড্রোন প্রতিরোধী অস্ত্র এবং উচ্চক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হবে।

অর্থাৎ, ৫ হাজার ডলারের গার্ডিয়ান হয়তো আকাশ প্রতিরক্ষার খরচ কমাতে পারে এবং বিপুলসংখ্যক সস্তা ড্রোন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু ইরানের হামলা যদি আরও দ্রুত ও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে, তাহলে সস্তা প্রতিরক্ষা ড্রোন একা সেই চাপ সামলাতে পারবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *