যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডীয় গাড়ি, মোটর পার্টস ও ইস্পাতের ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর পাল্টা চাপ তৈরির হুমকি দিয়েছে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমানো থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও অন্যান্য কৌশলগত পণ্যের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনার কথা জানিয়েছেন অন্টারিওর সরকারপ্রধান ডগ ফোর্ড।
ট্রাম্পের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কানাডায় উৎপাদিত গাড়ি, ট্রাক, মোটর পার্টস ও ইস্পাতের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে। এর আগে গত শনিবার থেকেই প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরই ওয়াশিংটন এ পদক্ষেপ নেয়।
এ পরিস্থিতিতে বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডগ ফোর্ড বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিকল্পই এখন বাদ দেওয়া হচ্ছে না। তার ভাষায়, ‘সব পথই খোলা আছে।’
ফোর্ডের সবচেয়ে বড় হুমকি এসেছে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে। অন্টারিও থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মিশিগান ও মিনেসোটাসহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ যায়। ট্রাম্প যদি কানাডার উৎপাদনশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন, তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো কিংবা সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অন্টারিওর সরকারপ্রধানের দাবি, প্রদেশটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৫ লাখ বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তাই সরবরাহে পরিবর্তন আনা হলে সীমান্তের ওপারের কিছু অঞ্চলে তার প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, কানাডার জ্বালানি তেল, পটাশ ও কৌশলগত খনিজকেও পাল্টা চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন ফোর্ড। তার মতে, ওয়াশিংটনের ওপর ধাপে ধাপে আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের বিষয়টি অটোয়ার বিবেচনা করা উচিত।
তবে ফোর্ডের অবস্থানের সঙ্গে কানাডার সব প্রাদেশিক সরকারপ্রধান পুরোপুরি একমত নন। জলবিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ কুইবেকের সরকারপ্রধান ক্রিস্টিন ফ্রেচেট আপাতত একই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেননি। যদিও দুই দেশের বিরোধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করায় ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও খনিজ সরবরাহ সীমিত করার সম্ভাবনাও তিনি পুরোপুরি নাকচ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ কানাডার বিদ্যুৎ?
জাতীয় পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কানাডার অংশ খুব বড় নয়। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র কানাডা থেকে প্রায় ২৪ দশমিক ৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় প্রায় ১৬ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ রপ্তানি করেছে।
মোট মার্কিন বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাবে কানাডার ওপর নির্ভরতা মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু জাতীয় গড়ের এই চিত্র সীমান্তবর্তী কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। নিউইয়র্ক, মিশিগান ও মিনেসোটার মতো অঙ্গরাজ্যে বিশেষ করে চাহিদা বাড়ার সময় কানাডীয় বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকেন্দ্রিক প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার নির্মাণ বাড়িয়ে দেওয়ায় স্থানীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে নিউইয়র্ক নতুন হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে এক বছরের স্থগিতাদেশ জারি করেছে। ফলে বিদ্যুতের জোগান নিয়ে সীমান্তের দুই পাশেই উদ্বেগ বাড়ছে।
আগেও বিদ্যুৎ নিয়ে চাপ দিয়েছিল অন্টারিও
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিদ্যুৎকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কথা অন্টারিও এবারই প্রথম বলছে না। ২০২৫ সালের মার্চে নিউইয়র্ক, মিশিগান ও মিনেসোটায় রপ্তানি করা বিদ্যুতের ওপর ২৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করেছিলেন ডগ ফোর্ড।
পরে কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক দ্বিগুণ করার হুমকি দিলে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পুরোনো চাপের কৌশল আবার সামনে এসেছে। তবে এবার শুধু বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের মতো খাতেও পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার আলোচনা হচ্ছে।
ট্রাম্পের পাল্টা আক্রমণ
ডগ ফোর্ডের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি ফোর্ডের হুমকিকে ‘ফাঁকা বুলি’ হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে কানাডার নেতাদের আরও নমনীয় হওয়ার বার্তা দেন তিনি।
পোস্টে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে আবারও ‘গভর্নর কার্নি’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র কানাডার তুলনায় অনেক বড়, ধনী ও শক্তিশালী দাবি করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া কানাডার টিকে থাকা কঠিন।
ফোর্ড অবশ্য ট্রাম্পের হুমকিতে পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত দেননি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যতই চাপ সৃষ্টি করুন, তিনি তার সামনে মাথা নত করবেন না।
বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন সংঘাত
এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও ওয়াশিংটনের নতুন শুল্ক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র কানাডার অটোমোবাইল শিল্পকে ধ্বংস করার মতো চাপ তৈরি করছে।
কার্নির ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু শর্ত দিয়েছিল, যা কানাডার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। গত শুক্রবার গভীর রাতে অটোয়া আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া ছিল অনেক বেশি, কিন্তু বিনিময়ে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল খুবই কম।
ফলে গাড়ি ও ইস্পাতের ওপর নতুন শুল্কের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ নিয়ে পাল্টাপাল্টি হুমকি দুই দেশের বাণিজ্য বিরোধকে আরও বিস্তৃত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা এবং এআইনির্ভর নতুন ডেটা সেন্টারের কারণে কানাডীয় বিদ্যুতের প্রশ্নটি এখন শুধু বাণিজ্য নয়, আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে।








