শনিবার সন্ধ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের ব্যস্ত ইন্টারস্টেট ২৭০ মহাসড়ক। বেথেসডার কাছে স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল একটি বাংলাদেশি পরিবারের গাড়ি। স্টিয়ারিংয়ে ছিলেন ফারুক হোসেন (৬২)। সঙ্গে স্ত্রী শামিমা বেগম (৪৬) এবং দুই মেয়ে, অর্থাৎ আরিহা জাহিন (২৩) ও রুবাইয়া হোসেন (৯)।
কিন্তু বিপরীত দিক থেকে আসা একটি গাড়ি তাদের যাত্রার পথটিই বদলে দেয়।
ভুল পথে মহাসড়কে ওঠা সেই গাড়িটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান শামিমা ও তার বড় মেয়ে আরিহা। গুরুতর আহত হন ফারুক ও ছোট মেয়ে রুবাইয়া।
পরে জানা যায়, ভুল পথে আসা গাড়িটির চালক হোসে কাবায়েরো-নোলাসকো (৩২) তখন মদ্যপ ছিলেন।
একটি পরিবারের জন্য কয়েক সেকেন্ডের সেই সংঘর্ষই হয়ে উঠেছে জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত।
প্রশ্ন এখন একটাই, কীভাবে মহাসড়কে উল্টো পথে উঠল গাড়িটি?
মন্টগোমারি কাউন্টির অ্যাটর্নি জন ম্যাককার্থির বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বিষয় নিশ্চিত কাবায়েরো-নোলাসকোর গাড়ি ভুল পথে যাচ্ছিল।
কিন্তু তদন্তকারীদের সামনে এখনও বড় প্রশ্ন হয়ে আছে, তিনি কোথা থেকে ইন্টারস্টেট ২৭০-এ উঠেছিলেন এবং কতক্ষণ ধরে উল্টো পথে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
এই তথ্যগুলো এখনো তদন্তাধীন।
অ্যাটর্নি ম্যাককার্থি তাই প্রত্যক্ষদর্শীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, কেউ যদি ওই গাড়িটিকে মহাসড়কে ওঠার সময় বা ভুল পথে চলতে দেখে থাকেন, তাহলে স্টেট পুলিশকে তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দুর্ঘটনার কয়েক মুহূর্ত আগে রাস্তায় কী ঘটেছিল, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য থেকেই তার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগ
ঘটনার পর তদন্তে আরও গুরুতর তথ্য সামনে আসে। মন্টগোমারি কাউন্টির অ্যাটর্নির ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত চালক মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
সোমবার আদালতে অভিযোগ শুনানির পর ৩২ বছর বয়সী কাবায়েরো-নোলাসকোকে আটক রাখার নির্দেশ দেন বিচারক।
তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে গুরুতর অবহেলাজনিত হত্যা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে হত্যা এবং মোটরযানের মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকির মতো আঘাত করার অভিযোগ।
অর্থাৎ তদন্তে এখন শুধু ভুল পথে গাড়ি চালানোর বিষয়টিই নয়, চালকের মদ্যপ অবস্থার বিষয়টিও মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এক গাড়িতে চারজন, ফিরলেন না দুজন
ফারুক হোসেনের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আলেকজান্দ্রিয়ায় বসবাস করত। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের বরগুনা থেকে অভিবাসন ভিসায় তারা যুক্তরাষ্ট্রে যান।
শনিবারের দুর্ঘটনায় পরিবারের চারজনের মধ্যে দুজনই প্রাণ হারান।
মা শামিমা বেগম ও বড় মেয়ে আরিহা জাহিনের শেষ বিদায় হয়েছে সোমবার। মেরিল্যান্ডের গেইথার্সবার্গের একটি ইসলামিক সেন্টারে জানাজা শেষে সেখানেই তাদের দাফন করা হয়।
শেষ বিদায়ে অংশ নিতে নিউ ইয়র্ক থেকে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা আনোয়ারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় আহত ফারুক হোসেনের বুকের সাতটি পাঁজরের হাড় ভেঙেছে এবং পিঠেও আঘাত পেয়েছেন। ছোট মেয়ে রুবাইয়ার মাথায় আঘাত লেগেছে। বাবা-মেয়েকে মেরিল্যান্ডের একটি হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
অভিযুক্ত চালকের পরিবারও এখন অনাগত সন্তানের অপেক্ষায়
অন্যদিকে দুর্ঘটনার পর অভিযুক্ত চালক কাবায়েরো-নোলাসকোর আইনজীবী শ্যারন ডায়মন্ড তার মক্কেলের অবস্থার কথা জানিয়েছেন।
আদালতের বাইরে তিনি বলেন, কাবায়েরো-নোলাসকো এল সালভাদরের একজন নির্মাণশ্রমিক। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তার বান্ধবী সন্তানসম্ভবা।
তবে তার যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অবস্থান রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য জানা যায়নি।
আইনজীবীর দাবি, ঘটনার পর তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা কাবায়েরো-নোলাসকোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত চালক তখনও হতভম্ব অবস্থায় ছিলেন এবং ঘটনার জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন।
তদন্তে এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হচ্ছে
এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো তদন্তের টেবিলে, কাবায়েরো-নোলাসকো কোথা থেকে মহাসড়কে উঠেছিলেন, কতক্ষণ ভুল পথে গাড়ি চালিয়েছিলেন এবং সংঘর্ষের আগে তার গাড়ির গতিপথ কী ছিল।
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণের জন্য নয়, মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তদন্তের তথ্য যতই সামনে আসুক, বাংলাদেশি পরিবারটির কাছে ঘটনার পরিণতি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত, একটি মা ও তার ২৩ বছর বয়সী মেয়েকে হারিয়ে পরিবারটির জীবনে তৈরি হয়েছে অপূরণীয় শূন্যতা।








