মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

বিদেশে এক পরিচয়, দেশে আরেক: এনআইডি-পাসপোর্টের গরমিলে বিপাকে প্রবাসীরা

বিদেশে বছরের পর বছর বৈধ পরিচয়ে বসবাস, রেসিডেন্স পারমিট, ব্যাংক হিসাব, চাকরির কাগজপত্র ঠিকঠাক। কিন্তু দেশে ফিরলেই শুরু হচ্ছে নতুন সংকট। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে বিদেশে ব্যবহৃত পাসপোর্টের তথ্য না মেলায় সরকারি-বেসরকারি নানা সেবা থেকে ছিটকে পড়ছেন গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা।

বিশেষ করে নাম, জন্মসাল কিংবা জন্মতারিখে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিদেশে ব্যবহৃত পাসপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া রেসিডেন্স পারমিট ও অন্যান্য নথিপত্র একদিকে, আর দেশে থাকা এনআইডিতে ভিন্ন পরিচয়ের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় করতে গিয়ে মাসের পর মাস প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকতে হচ্ছে তাদের।

অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে যাওয়ার সময় দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে ভুল তথ্যের পাসপোর্ট তৈরি করা কিংবা নিজের তথ্য সম্পর্কে অসচেতনতার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সূত্রপাত। পরে সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে বৈধ কাগজপত্র তৈরি হওয়ায় ভুল তথ্যই সেখানে প্রবাসীর সরকারি পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।

দালালের দেওয়া তথ্যেই বিদেশে সব কাগজ
হবিগঞ্জের মশিউর রহমান মুমিনের ঘটনাটি এ সমস্যার একটি উদাহরণ। তার এনআইডিতে জন্মসাল ১৯৯৫ সালের জুলাই মাস। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার সময় এক দালালের মাধ্যমে তৈরি করা পাসপোর্টে তার নাম দেওয়া হয় ‘মশিউর মিয়া’ এবং জন্মসাল উল্লেখ করা হয় ১৯৯৯।

এই পাসপোর্ট ব্যবহার করেই তিনি গ্রিসে যান। পরবর্তীতে ওই পরিচয়ের ভিত্তিতেই তৈরি হয় রেসিডেন্স পারমিটসহ বিভিন্ন বৈধ নথিপত্র। অর্থাৎ গ্রিসে তার জীবনযাপনের সরকারি রেকর্ডে এক ধরনের পরিচয়, আর বাংলাদেশের এনআইডিতে রয়েছে আরেক তথ্য।

দেশে ফিরে সমস্যাটি প্রকট হয়ে ওঠে। ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গেলে এনআইডির তথ্যের সঙ্গে বিদেশে ব্যবহৃত পাসপোর্ট ও গ্রিক নথিপত্রের অমিল ধরা পড়ে। এরপর এনআইডির তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করেও দীর্ঘদিনে সমাধান পাননি তিনি।

মশিউর রহমান মুমিন বলেন, বিদেশ যাওয়ার সময় দালালের মাধ্যমে আমার পাসপোর্টে নাম ও জন্মসালের তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছিল। ওই পাসপোর্ট দিয়েই গ্রিসে রেসিডেন্স পারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র করেছি। এখন দেশে এসে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়েও সমস্যায় পড়েছি। এনআইডি সংশোধনের জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু দীর্ঘদিনেও সমাধান হয়নি।

পাসপোর্ট নবায়নেও বাধা
একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন দীর্ঘদিন গ্রিসে থাকা রফিকুল ইসলাম। বিদেশে থাকার সময় ব্যবহৃত পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী তার অন্যান্য নথিপত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেশে ফিরে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে এনআইডির সঙ্গে তথ্যের অমিল ধরা পড়ে। এতে নবায়ন প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে যায়।

রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। বিদেশে থাকা অবস্থায় যে পাসপোর্ট ব্যবহার করেছি, সেটির তথ্য অনুযায়ী আমার অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি হয়েছে। দেশে ফিরে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে দেখি এনআইডির তথ্যের সঙ্গে পাসপোর্টের তথ্যের মিল নেই। ফলে নবায়ন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

তার মতে, বিদেশে বৈধভাবে ব্যবহৃত নথিপত্র যাচাই করে এ ধরনের সমস্যার দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিদেশে তৈরি হওয়া সরকারি নথিপত্রের তথ্য যাচাই করে অন্তত একবার এনআইডি সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

‘ভুল তথ্যের দায় প্রবাসীদের ওপর চাপানো যাবে না’
গ্রিসের কমিউনিটি নেতা জাহিদ ইসলামের মতে, বিদেশে যাওয়ার সময় অনেক বাংলাদেশি দালাল কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে ভুল নাম, বয়স বা জন্মতারিখের পাসপোর্ট হাতে পান। পরে ওই পাসপোর্টের তথ্যই বিদেশে তাদের আনুষ্ঠানিক পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তিনি বলেন, ওই পরিচয়ের ভিত্তিতে রেসিডেন্স পারমিট, ব্যাংক হিসাব, চাকরির নথিসহ একাধিক বৈধ কাগজ তৈরি হওয়ার পর দেশে থাকা এনআইডির তথ্যের সঙ্গে অমিল হলে প্রবাসীরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন।

জাহিদ ইসলামের ভাষায়, প্রকৃত পরিচয় এবং বিদেশে ব্যবহৃত বৈধ নথিপত্র যাচাই করে প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের জন্য বিশেষ ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

কঠোর নিয়মে আটকে যাচ্ছে সংশোধনের আবেদন
বর্তমানে এনআইডি সংশোধনে নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে। পাসপোর্ট ও এনআইডির মধ্যে বড় ধরনের অমিল থাকলে, যেমন জন্মসালে পাঁচ থেকে ১০ বছর বা তার বেশি পার্থক্য কিংবা নামের বড় পরিবর্তন, তা জটিল সংশোধনের আওতায় পড়ে।

এ ধরনের ক্ষেত্রে বয়স বা পরিচয় প্রমাণের জন্য জন্ম নিবন্ধন, এসএসসি সনদ কিংবা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অ্যাফিডেভিটের মতো নথি চাওয়া হয়।

সমস্যা হচ্ছে, বিদেশে গিয়ে দীর্ঘদিন যে পরিচয়ে একজন বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করেছেন, সেই পরিচয়ের পক্ষে থাকা রেসিডেন্স পারমিটসহ বিদেশি নথিপত্রকে এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে একক ও সরাসরি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। ফলে অনেক আবেদন দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে থাকছে।

দেশে ফিরলেই বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে এনআইডি
বিদেশে অবস্থানকালে এনআইডির প্রয়োজন অনেক সময় তেমন অনুভূত না হলেও দেশে ফেরার পর এর গুরুত্ব সামনে আসে। ড্রাইভিং লাইসেন্স করা থেকে শুরু করে ব্যাংক হিসাব খোলা, জমি কেনাবেচা, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ও আয়কর রিটার্নসহ বিভিন্ন কাজে এনআইডি প্রয়োজন হয়।

ফলে বিদেশে থাকা অবস্থায় বছরের পর বছর কোনো সমস্যা ছাড়াই ব্যবহৃত পরিচয় দেশে ফিরে কার্যত বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রবাসীদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থাকা বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি একই ধরনের এনআইডি-পাসপোর্ট জটিলতার মুখোমুখি। বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাস থেকেও এনআইডি-সংক্রান্ত সেবা পেতে অনেক সময় বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে। তথ্যের অমিলই এসব জটিলতার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তারা।

বিশেষ সংশোধন ও ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থার দাবি
সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি সামনে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিদেশে ব্যবহৃত বৈধ নথিপত্র যাচাই করে বিশেষ বিবেচনায় এনআইডি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া।

প্রবাসীরা চান, বৈধ ই-পাসপোর্ট, রেসিডেন্স পারমিট এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র সরেজমিনে যাচাই করে অন্তত একবারের জন্য তথ্য সংশোধনের সুযোগ রাখা হোক।

একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের জন্য পৃথক ডেস্ক বা ডেডিকেটেড সেল চালুর দাবিও রয়েছে। তাদের মতে, ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থায় আবেদন নিষ্পত্তি করা গেলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।

প্রবাসীদের ভাষ্য, দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে অবদান রাখার পরও দেশে ফিরে নিজের পরিচয় সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতায় পড়া তাদের জন্য হতাশাজনক। বিদেশে বৈধভাবে ব্যবহৃত নথির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনআইডি সংশোধনের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করাই এখন তাদের প্রধান প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *