বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

ইতালির স্বপ্নে ৭১ লাখ টাকা খরচ, শেষে লিবিয়ায় ৯৩ দিনের বন্দিজীবন

ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মাদারীপুরের মশিউর রহমান ও সোহেল মিয়া। একজনের স্বপ্নের পেছনে খরচ হয়েছে ৩২ লাখ টাকা, অন্যজন দিয়েছেন ৩৯ লাখ। সেই টাকা জোগাড় করতে কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন, কেউ বিক্রি করেছেন পৈতৃক জমি। কিন্তু ইউরোপে পৌঁছানোর বদলে তাদের ঠাঁই হয়েছে লিবিয়ার বন্দিশিবিরে।

সাগরপথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে আটক হওয়ার পর ৪৫ ও ৪৮ দিন করে ত্রিপলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী ছিলেন তারা। সেখানে গাদাগাদি করে থাকা, মারধর, খাবারের সংকট ও লোনাপানি পান করেই দিন কাটাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় দেশে ফিরেছেন তারা।

মঙ্গলবার সকালে বুরাক এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে লিবিয়া থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান মশিউর, সোহেলসহ ১৭৪ বাংলাদেশি। বিমানবন্দর থেকে গুলিস্তান যাওয়ার পথে বাসে বসে নিজেদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান দুজন।

হোটেল ব্যবসা ছেড়ে মশিউরের ইউরোপযাত্রা
মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের ৩৮ বছর বয়সী মশিউর রহমান দেশে একটি খাবারের হোটেল চালাতেন। পরোটা ও শিঙাড়া তৈরিতে দক্ষ ছিলেন তিনি। নিজের ব্যবসাও ভালোই চলছিল।

তবে পাঁচ বছর ধরে ইতালিতে থাকা ছোট ভাইয়ের জীবন দেখে তার মধ্যেও ইউরোপ যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। পরিবারের সদস্যরা এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় রাজি ছিলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের মতের বাইরে গিয়ে গত বছরের ডিসেম্বরে দেশ ছাড়েন মশিউর।

মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও কুয়েত হয়ে তিনি পৌঁছান মিসরে। সেখানে প্রায় পাঁচ মাস থাকার পর দালালের মাধ্যমে তাকে নেওয়া হয় লিবিয়ার আল-খমস শহরে। সেখানে একটি কথিত ‘গেম ঘরে’ প্রায় তিন মাস আটকে রাখা হয়।

ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন ধাপে মশিউরের পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৩২ লাখ টাকা। লিবিয়ায় বন্দী করা কিংবা মারধরের ভয় দেখিয়ে ফোনে চাপ দেওয়া হতো। সেই ভয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করে দালালের স্থানীয় প্রতিনিধির হাতে অর্থ তুলে দেয় পরিবারটি।

আধা ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রা, তারপর বন্দিশিবির
প্রায় তিন মাস আগে আল-খমস থেকে কাঠের নৌকায় ৩০ বাংলাদেশি ও চার মিসরীয়কে নিয়ে শুরু হয় মশিউরের ‘গেম’। কিন্তু সমুদ্রে নামার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই লিবিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে নৌকাটি।

এরপর তাদের নেওয়া হয় ত্রিপলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে। সেখানে ৪৫ দিন কাটাতে হয় মশিউরকে।

মশিউরের ভাষ্য, প্রায় ২০০ জনের থাকার উপযোগী একটি কক্ষে ৫০০ জনকে রাখা হয়েছিল। তদারকিতে থাকা নাইজেরিয়ানদের হাতে লম্বা পাইপ থাকত। সামান্য বিষয়েও তাদের মারধর করা হতো।

তবে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি খাবারের সংকটই ছিল তার কাছে সবচেয়ে কষ্টের। ৪৫ দিনে একবারও ভাত চোখে দেখেননি তিনি। সকাল ১০টার দিকে দেওয়া হতো মোটা রুটি। দুপুরে পাস্তা। সাতজনের জন্য বরাদ্দ থাকত মাঝারি আকারের এক বাটি খাবার। দুপুরের রান্না করা খাবারই আবার রাতে দেওয়া হতো।

মশিউর বলেন, খাবার খাওয়ার সময় প্রায়ই কেউ না কেউ কাঁদতেন। খাবার কম হওয়ায় কারও পেট ভরত না। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও ছিল না; কলের লোনাপানি পান করেই থাকতে হয়েছে তাদের।

দেশে ফেরার বিমানে ভাত পেয়ে সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে যায় মশিউরের। তার কথায়, ‘ভাতের দিকেই চাইয়া ছিলাম ভাই, মুখে কী দিব? বিমানে ভাত দেইখাই পেট ভরে গেছে।’

সোহেলের স্বপ্নে বিক্রি হয়ে যায় জমি
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটের ৩৬ বছর বয়সী সোহেল মিয়ার গল্পও অনেকটা একই। দেশে অটোরিকশা চালাতেন তিনি। গ্রামের অনেক তরুণের মতো তারও স্বপ্ন ছিল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে গিয়ে জীবন বদলে ফেলা।

১৪ মাস আগে সেই স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছাড়েন সোহেল। মশিউরের মতোই মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কুয়েত ও মিসর হয়ে তিনি লিবিয়ায় পৌঁছান।

ইতালি যাওয়ার আশায় ধাপে ধাপে ৩৯ লাখ টাকা দেন দালালকে। প্রথমে ১৭ লাখ, পরে আরও ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এত টাকা জোগাড় করতে গিয়ে পৈতৃক জায়গাজমিও বিক্রি করে সোহেলের পরিবার।

শেষ পর্যন্ত আরও ১০ লাখ টাকা দিয়ে সুমন নামের এক দালালের মাধ্যমে আলাদাভাবে ‘গেম’ দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু খমস থেকে ফাইবার বোটে সমুদ্রে নামার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই সেনাদের হাতে ধরা পড়েন সোহেল ও তার সঙ্গীরা।

‘বিক্রি’ হওয়ার চেয়ে বন্দিশিবির বেছে নেন
সোহেল জানান, আটকের পর তাদের অন্য মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেখান থেকে মুক্ত হতে প্রয়োজন ছিল আরও ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।

এই পরিস্থিতিতে সেনাদের কাছে তারা অনুরোধ করেন, তাদের যেন অন্য কারও কাছে বিক্রি না করে তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। কারণ সেখানে আইওএমের কার্যক্রম রয়েছে এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাজুরায় ৪৮ দিন কাটিয়ে দেশে ফেরেন সোহেল।

তার কাছেও খাবারের সংকট ছিল বড় কষ্টের। তবে বন্দিশিবিরের প্রচণ্ড গরম তাকে আরও বেশি ভুগিয়েছে। ফ্যান থাকলেও এত মানুষের তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। ফলে কক্ষের ভেতর প্রায় দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি হতো।

বন্দিশিবিরেই কেটেছে কোরবানির ঈদ
তাজুরায় থাকা অবস্থায় কোরবানির ঈদও পার করেছেন সোহেল। কিন্তু ঈদের দিনেও ছিল না কোনো বিশেষ খাবার বা আনন্দ। অন্য দিনের মতো পাস্তা খেয়েই কেটেছে দিনটি।

সোহেলের ভাষায়, ‘ওইটা কি ঈদের দিন? সারা দিন কান্না করছি আর আল্লাহরে কইছি, মাবুদ, আমারে দেশ না দেখাইয়া নিয়ো না।’

দেশে ফিরেও শেষ হয়নি সংকট
দেশে ফিরলেও মশিউর ও সোহেলের সমস্যার শেষ হয়নি। বরং সামনে এখন বড় ঋণের বোঝা। দেশে ফেরার পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের সঙ্গে কথা বলেছে। দালালদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যোগাযোগের নম্বরও দেওয়া হয়েছে। আইওএম জানিয়েছে, প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যাবে।

সোহেল আর বিদেশ যেতে চান না। দেশে একটি অটোরিকশার ব্যবস্থা হলে সেটি চালিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে চান তিনি। তার ভাষায়, ‘পরিবার নিয়ে কষ্ট করে চলব, কিন্তু বিদেশের নাম আর নেব না।’

মশিউরের সামনে আরও বড় দুশ্চিন্তা চড়া সুদের ৩২ লাখ টাকার ঋণ। আপাতত গ্রামে ফিরে যেতে চান তিনি। ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটি ছেড়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তার ওপর।

তবে ইতালির স্বপ্ন পুরোপুরি মাথা থেকে মুছে গেছে কি না, সেই প্রশ্নে তার মুখে ছিল হাসি। বললেন, ‘ইতালির ক্যারা ভাই যার মাথায় একবার উঠেছে, আর কি নামে?’

কেন থামছে না এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা?
লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে অনেকেই জানেন। তারপরও উন্নত জীবন ও বেশি আয়ের আশায় প্রতিবছর বিপজ্জনক এই পথে পা বাড়ান বাংলাদেশিরা। কেউ গন্তব্যে পৌঁছান, আবার কেউ সাগরেই নিখোঁজ বা মৃত্যুর শিকার হন।

মশিউরের উপলব্ধি, ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে এই যাত্রা মূলত একটি ফাঁদে পরিণত হয়েছে। পরিচিত কেউ ইতালিতে গিয়ে ভালো আয় করছেন, এই খবরই অনেককে ঝুঁকি নিতে প্ররোচিত করে।

মশিউর বলেন, ‘আরেকজন ইতালি গিয়ে লাখ টাকা বেতন পাচ্ছে, এটা দেখে কারও মাথা ঠিক থাকে না। যাওয়ার পর বোঝা যায়, এ পথ কত কষ্টের।’

গুলিস্তানে পৌঁছে দুজনের তাড়া ছিল বাড়ি ফেরার। মাদারীপুরের বাস ধরতে দ্রুত হাঁটছিলেন তারা। যাওয়ার আগে তাদের একটাই অনুরোধ, দালালের কাছ থেকে যদি কিছু টাকা উদ্ধার করা যায়, তাহলে হয়তো ঋণের বোঝা কিছুটা কমবে।

আর অন্য তরুণদের জন্য তাদের বার্তা আরও স্পষ্ট: ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নের নামে দালালের কথায় জীবন ও সর্বস্ব বাজি না রেখে এই পথ থেকে দূরে থাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *