মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

মালয়েশিয়ায় মাটিচাপায় মৃত্যু: বিয়ের স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরার কথা, ফিরছেন লাশ হয়ে

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা ছিল শরিফুল ইসলাম ফকিরের। প্রবাসজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি পাকা বাড়ি করবেন, বিয়ে করে নতুন করে সংসার শুরু করবেন, এমন পরিকল্পনাই ছিল ২৬ বছর বয়সী এই যুবকের। পরিবারের আর্থিক সংকটও ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি।

কিন্তু সেই স্বপ্নের আর কোনো বাস্তবায়ন হবে না। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) মালয়েশিয়ায় একটি নির্মাণাধীন প্রকল্পে কাজ করার সময় আকস্মিক মাটি ধসে চাপা পড়ে মারা গেছেন শরিফুল। যে প্রবাসে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানেই মাটির নিচে চাপা পড়েছে তার জীবন ও স্বপ্ন।

পরিবারের একমাত্র বড় ভরসা
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি গ্রামের মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা শরিফুল প্রায় চার বছর আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান। উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের অভাব দূর করা।

চার ভাইয়ের পরিবারে বড় ভাই মানসিক প্রতিবন্ধী। মেজ ভাই তিন বছর আগে দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যান। আর ছোট ভাই স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সম্প্রতি কলেজে ভর্তি হয়েছেন। এমন বাস্তবতায় পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে শরিফুলের কাঁধে।

প্রবাসে কাজ করে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় দিয়ে একটি ভালো পাকা বাড়ি করার ইচ্ছাও ছিল তার।

কিন্তু একটি নির্মাণস্থলে মাটি ধসের ঘটনায় মুহূর্তেই বদলে গেল সবকিছু।

নির্মাণস্থলে দুর্ঘটনা, পরিবারের সামনে এখন নতুন সংকট
সোমবার মালয়েশিয়ার একটি শহরে একটি কন্সট্রাকশন কোম্পানির নির্মাণাধীন প্রকল্পে কাজ করছিলেন শরিফুল। এ সময় আকস্মিক মাটি ধসে তিনি মাটির নিচে চাপা পড়েন এবং মারা যান।

শরিফুলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুধু একটি প্রাণহানি ঘটেনি; তার ওপর নির্ভরশীল একটি পরিবারও হারিয়েছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনক্ষম সদস্যকে।

স্বজনদের ভাষ্য, পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় শরিফুলের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাকে হারিয়ে এখন পরিবারটি দিশেহারা। একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে পরিবারটির সামনে।

দেশে ফেরার বদলে মরদেহের অপেক্ষা
শরিফুলের মা এখন আর ছেলের দেশে ফেরার অপেক্ষায় নেই। অপেক্ষা করছেন সন্তানের মরদেহের।

সন্তান হারানোর শোকে বাকরুদ্ধ মা শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে চান। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও এখন একটাই দাবি, প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

ঘটনার পর বর্ণি গ্রামেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর মধ্যে চলছে শোকের মাতম।

প্রশ্ন এখন মরদেহ ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে
শরিফুলের পরিবার ও স্বজনদের সবচেয়ে জরুরি চাওয়া এখন মরদেহ দ্রুত দেশে আনা। তাদের দাবি, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় যেন বিষয়টিতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করে।

প্রবাসে কর্মরত একজন বাংলাদেশির মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে ফেরাতে আনুষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। শরিফুলের ক্ষেত্রেও সেই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।

তাদের প্রশ্ন, যে যুবক পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলানোর আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর অন্তত শেষবারের মতো পরিবারের কাছে তাকে ফিরিয়ে দিতে আর কতটা অপেক্ষা করতে হবে?

যে স্বপ্নগুলো আর পূরণ হবে না
শরিফুলের স্বপ্ন ছিল দেশে ফিরবেন। বিয়ে করবেন। সংসার গড়বেন। নিজের হাতে একটি পাকা বাড়ি বানাবেন। পরিবারের অভাব দূর করবেন।

কিন্তু এখন তার সেই স্বপ্নগুলো শুধু পরিবারের স্মৃতিতে।

মালয়েশিয়ার নির্মাণস্থলে মাটিচাপা পড়া শরিফুলের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে স্বজনরা। তাদের কাছে এখন ডিসেম্বরের বিয়ের আয়োজন নয়, সবচেয়ে বড় অপেক্ষা প্রিয় মানুষটির শেষবারের মতো মুখ দেখা।

শরিফুলের পরিবারের দাবি, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *