শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

বিদেশে গিয়ে প্রতিবছর গড়ে ১০০ নারী শ্রমিকের মৃত্যু

বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকের বিদেশযাত্রাও বাড়ছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের এই প্রবাহের বিপরীতে তাদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ ও অধিকার সুরক্ষার চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান ও চাকরির শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছাড়াই বিদেশে গিয়ে অনেক নারীকে নির্যাতন, মজুরি বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

কেউ দেশে ফিরছেন দীর্ঘদিনের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে, আবার কারও দেশে ফেরার সুযোগ হচ্ছে কফিনে।

সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অর্থাৎ এ সময়ে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ১০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে।

একই সময়ে বিদেশে নারী কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আরও ৫ হাজার ২১৪ জন বেশি নারী বিদেশে গেছেন, যা প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি।

বিদেশযাত্রা বাড়লেও সুরক্ষার প্রশ্ন
সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী কর্মীর বিদেশযাত্রার তথ্য তুলে ধরে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানান। তার বক্তব্যে উঠে আসে মজুরি বঞ্চনা, চুক্তির শর্ত ভঙ্গ এবং বিদেশে নারী কর্মীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি।

নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তাদের তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।

জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। বিদেশে থাকা কর্মীরাও এই নম্বরে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাস সহায়তা করে।

নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে ফিরছেন হাজারো নারী
বিদেশফেরত নারী কর্মীদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসছে আরও একটি কঠিন বাস্তবতা। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় একটি অংশ বিদেশে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।

২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম ওকাপের এক গবেষণাতেও বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের কঠিন চিত্র পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা বলেছেন।

চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন ৯৭ শতাংশ নারী। একই সংখ্যক নারী জানিয়েছেন, তারা সাপ্তাহিক ছুটি পাননি। আর ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।

গৃহকর্মেই আটকে বড় অংশ
বিদেশে যাওয়া নারী কর্মীদের বড় একটি অংশ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এই খাতে কর্মীদের কর্মপরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হওয়ায় ঝুঁকিও তৈরি হয়। পাসপোর্ট আটকে রাখা, গৃহবন্দী করে রাখা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, বেতন না দেওয়া কিংবা চুক্তিতে উল্লেখ করা কাজ ও বাস্তব কাজের মধ্যে পার্থক্যের অভিযোগ রয়েছে।

বিদেশে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত ভাষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। অনেকের কাছে নিয়োগকর্তা, কর্মস্থল, চাকরির শর্ত কিংবা গন্তব্য দেশের শ্রম আইন সম্পর্কেও পর্যাপ্ত তথ্য থাকে না।

নতুন শ্রমবাজারে সম্ভাবনা, প্রয়োজন প্রস্তুতির
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সময়ে ৪৮টি দেশে ৪২ হাজারের বেশি নারী কর্মী গেছেন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি কর্মীর গন্তব্য ছিল সৌদি আরব ও জর্দান।

এর বাইরে জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ নতুন নতুন শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, নতুন শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার আগে তাদের যথাযথ প্রস্তুতিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তার মতে, ভাষা, পেশাগত দক্ষতা এবং গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ থাকলে বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

তিনি নারীদের শুধু গৃহকর্মে সীমাবদ্ধ না রেখে নার্সিং ও পরিচর্যাসহ দক্ষতাভিত্তিক বিভিন্ন পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুরের ভাষ্য, নারী শ্রমিকেরা বিদেশে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

তার মতে, দালালদের দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতিতে বিদেশে গিয়ে অনেক নারী বাস্তবে ভিন্ন ধরনের কাজ, কম বেতন কিংবা প্রতিশ্রুতির বাইরে থাকা কর্মপরিবেশের মুখোমুখি হচ্ছেন।

নারী কর্মীদের বিদেশযাত্রা বাড়লেও তাই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের কতটা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সেখানে গিয়ে বিপদে পড়লে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *