জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে দেশটিতে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও ভিসা পাওয়ার পর নতুন এক সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের, আবাসন। আর তীব্র এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনে ভুয়া বাসার বিজ্ঞাপন দিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কম ভাড়ায় আকর্ষণীয় বাসার বিজ্ঞাপন দিয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। পরে অগ্রিম ভাড়া বা জামানতের নামে টাকা নেওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে যোগাযোগের সব পথ। জার্মানিতে পৌঁছে অনেক শিক্ষার্থী জানতে পারছেন, বিজ্ঞাপনে দেওয়া ঠিকানায় আদৌ কোনো বাসা খালি নেই।
ভিসা পাওয়ার পর নতুন বিপদ
ঢাকার জামিলুর রহমান জার্মানির বার্লিনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন। সেপ্টেম্বরে ক্লাস শুরুর কথা থাকলেও ভিসা পাওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে বাসা খুঁজছিলেন তিনি।
একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গ্রুপে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি জামিলুরকে একটি বাসার প্রস্তাব দেন এবং বাসা নিশ্চিত করতে দুই মাসের অগ্রিম ভাড়া হিসেবে ১ হাজার ২০০ ইউরো চান।
কম ভাড়ায় বাসাটি পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ থেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন জামিলুর। কিন্তু ১৫ সেপ্টেম্বর বার্লিনে পৌঁছে ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে আর সাড়া পাননি। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনের লিংকটিও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরে দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে আরও বড় ধাক্কা খান তিনি। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, ফ্ল্যাটটিতে আগে থেকেই অন্য একজন ভাড়াটে বসবাস করছেন।
চুক্তিপত্রও ছিল, ছিল না বাসা
চট্টগ্রামের শারমিন আক্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। জার্মানির কটবুসে স্নাতকোত্তর পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় ফেসবুকের একটি শিক্ষার্থী আবাসন গ্রুপে একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের বিজ্ঞাপন দেখতে পান তিনি।
ছবিতে বাসাটি দেখতে ভালো ছিল এবং ভাড়াও তুলনামূলক কম। এ কারণে সন্দেহ হয়নি শারমিনের। তার কাছে চুক্তিপত্রের মতো একটি কাগজও পাঠানো হয়। এরপর অগ্রিম হিসেবে প্রায় ৮৫০ ইউরো চাওয়া হলে তিনি টাকা পাঠিয়ে দেন।
কিন্তু টাকা পাঠানোর পরদিনই বিজ্ঞাপনদাতার ফেসবুক আইডি বন্ধ হয়ে যায়। জার্মানিতে পৌঁছে শারমিন ওই ঠিকানায় গিয়ে জানতে পারেন, সেখানে কোনো খালি ফ্ল্যাটই নেই। শেষ পর্যন্ত সাময়িকভাবে একটি বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে থাকতে হয় তাকে।
ভিডিওকলে বাসা দেখে প্রতারিত
ফ্রাঙ্কফুর্টে একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন রাকিবুল হাসান। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে একটি রুম ভাড়া নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ভিডিওকলে বাসাটি দেখানো হয়েছিল। ফলে পুরো বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় রাকিবুলের কাছে। জার্মানিতে যাওয়ার আগেই তিনি জামানতের টাকা পাঠিয়ে দেন।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, সেটি কোনো আবাসিক ফ্ল্যাট নয়; একটি অফিস ভবন। এরপর সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বরেও আর যোগাযোগ করা যায়নি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অফিসের সহযোগিতায় সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করতে হয় তাকে।
‘বাসা পাওয়া এখন সোনার হরিণ’
জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরান হোসাইন বলেন, দেশটিতে নতুন আসা শিক্ষার্থীদের অনেকেই বাসা খুঁজতে গিয়ে একই ধরনের প্রতারণার মুখোমুখি হচ্ছেন।
তার ভাষ্য, জার্মানিতে বর্তমানে বাসা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সংকটের সুযোগই নিচ্ছে প্রতারকরা। তার পরামর্শ, জার্মানিতে আসার আগে বাংলাদেশ থেকে অপরিচিত ব্যক্তিকে বাসার জন্য টাকা না পাঠানোই নিরাপদ। জার্মানিতে পৌঁছে অথবা সেখানে অবস্থানরত পরিচিত কারও মাধ্যমে যাচাই করে অর্থ লেনদেন করা উচিত।
কম ভাড়ার অফারেও থাকতে হবে সতর্ক
বার্লিনের সাংস্কৃতিক সংগঠক জাহিদ কবির হিমন জানান, সম্প্রতি হ্যানোভারে তার এক বন্ধুও বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার বন্ধু বেলজিয়ামে একটি বাড়ি ভাড়া নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। কথিত বাড়ির মালিক জানান, তিনি ব্যক্তিগত কাজে আয়ারল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তাই অগ্রিম টাকা আয়ারল্যান্ডের একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠাতে হবে।
টাকা পাঠানোর পর বাসার চাবি পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। চাবি পাঠানো হলেও পরে দেখা যায়, সেটি আসল চাবি নয়।
জাহিদ কবির হিমন বলেন, বাংলাদেশ থেকে জার্মানি বা ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা অন্য দেশের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শুধু সুন্দর ছবি, ভালো লোকেশন কিংবা তুলনামূলক কম ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
তার মতে, পরিচিত বাংলাদেশি বা বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে বাসার তথ্য যাচাই করে তারপর অর্থ লেনদেন করা নিরাপদ। কারণ প্রতারকরা অনেক সময় ভালো লোকেশনে কম ভাড়ার আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়েই আগ্রহীদের ফাঁদে ফেলছে।
জার্মানিতে নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন দপ্তর, আন্তর্জাতিক অফিস কিংবা স্থানীয়ভাবে যাচাইযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে বাসা খোঁজা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তীব্র আবাসন সংকটের মধ্যে দ্রুত বাসা পাওয়ার চাপই অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে, আর সেই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে উঠছে প্রতারকরা।








