শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

ডলার সংকটে মালদ্বীপ, ৫০-১০০ ডলার রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ খুঁজছে বাংলাদেশ

মালদ্বীপে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে দেশে টাকা পাঠাতে সমস্যায় পড়ছেন সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিরা। স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়ায় আয় করা বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর জন্য স্বল্প পরিমাণ অর্থও যাতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়, সে পথ খুঁজছে বাংলাদেশ হাইকমিশন।

এ লক্ষ্যে মালদ্বীপে কর্মরত বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে হাইকমিশন। এর অংশ হিসেবে দেশটিতে কার্যরত ভারতীয় স্টেট ব্যাংক, শ্রীলঙ্কার ব্যাংক অব সিলন ও পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন মালদ্বীপে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম।

মালে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

বড় অঙ্ক নয়, ছোট রেমিট্যান্সের পথ খোঁজা হচ্ছে
হাইকমিশনের আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য অন্তত ৫০ থেকে ১০০ ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

হাইকমিশনার ড. নাজমুল ইসলাম বলেন, এ উদ্যোগের লক্ষ্য কোনো বিশেষ সুবিধা আদায় নয়। বরং বিদ্যমান আইন, বিধিবিধান ও ব্যাংকিং কাঠামোর মধ্যেই স্বল্প পরিমাণ অর্থ পাঠানোর একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করা।

তার মতে, রুফিয়ায় বেতন পাওয়া একজন শ্রমিকের কাছে ৫০ বা ১০০ ডলারও পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের অর্থ বৈধ পথে দেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হলে প্রবাসীদের আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়তে পারে।

রুফিয়া থেকে ডলারে রূপান্তরই বড় বাধা
মালদ্বীপের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর জন্য স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়াকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর এবং দেশ থেকে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

হাইকমিশনের ভাষ্য, সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। মালদ্বীপের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি ও ব্যাংকিং খাতের তারল্যের সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সমস্যার ধরন কিছুটা আলাদা। মালদ্বীপে বসবাসরত ১ লাখের বেশি বাংলাদেশির অধিকাংশই অর্ধদক্ষ ও নিম্নদক্ষ কর্মী। তাদের বড় অংশ রুফিয়ায় বেতন পান। ফলে দেশে টাকা পাঠানোর আগে রুফিয়াকে ডলারে রূপান্তরের প্রয়োজন হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

অন্যদিকে অন্যান্য কয়েকটি দেশের প্রবাসীদের বড় একটি অংশ দক্ষ ও পেশাজীবী হওয়ায় তারা ডলারে বেতন পান কিংবা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ রাখেন।

ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও কমেছে সীমা
বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে বৈঠকে মালদ্বীপে অন্যান্য দেশের প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

হাইকমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ভারতীয় স্টেট ব্যাংকের মাধ্যমে একসময় ভারতীয় প্রবাসীরা মাসে সর্বোচ্চ ৭০০ ডলার পর্যন্ত পাঠাতে পারতেন। ধাপে ধাপে সেই সীমা কমে বর্তমানে ১৫০ ডলারে নেমেছে।

ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে মুদ্রা রূপান্তর ও কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থার আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা থেকেও বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোনো সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে কি না, বৈঠকে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার ব্যাংক অব সিলন জানিয়েছে, মুদ্রা রূপান্তরের জটিলতার কারণে নতুন রেমিট্যান্স হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও তারা ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছে।

পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর সীমা ১ হাজার ডলার থেকে কমে বর্তমানে ৩০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে মালদ্বীপে পাকিস্তানি প্রবাসীর সংখ্যা তুলনামূলক কম, প্রায় ৪০০ থেকে ৭০০ জন। ফলে তাদের রেমিট্যান্স রূপান্তরের চাপও তুলনামূলক কম।

বৈদেশিক মুদ্রা সংকটেই আটকে যাচ্ছে রেমিট্যান্স
হাইকমিশনের বৈঠকগুলোতে আলোচনার মূল বিষয় ছিল মালদ্বীপের বর্তমান ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের তারল্য, মুদ্রা রূপান্তর এবং প্রবাসীদের অর্থ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা।

বাংলাদেশি কর্মীদের সংখ্যা অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় তাদের রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনায় আলাদা চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় মুদ্রায় বেতন পাওয়া শ্রমিকদের উপার্জন ডলারে রূপান্তর করে দেশে পাঠানোর প্রয়োজন থাকায় বিদ্যমান সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

এ অবস্থায় ছোট অঙ্কের রেমিট্যান্সের জন্য বাস্তবসম্মত কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরি করা যায় কি না, সেটিই এখন হাইকমিশনের আলোচনার অন্যতম বিষয়।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা
রেমিট্যান্সের পাশাপাশি বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারের মধ্যে ভবিষ্যতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থায়ন এবং বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানোর সম্ভাবনাও বৈঠকে আলোচিত হয়েছে।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর সুযোগ সহজ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, মালদ্বীপে থাকা বাংলাদেশিরা কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান। তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যমান ব্যাংকিং কাঠামোর মধ্যে সম্ভাব্য টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা দায়িত্বের অংশ।

মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রবাসীদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও বৈধ রেমিট্যান্স ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *