মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবশেষ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা, দ্রুত কর্মী পাঠানোর দাবি বায়রার

মালয়েশিয়ায় নতুন করে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলেও সময়মতো বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতে না পারলে বড় একটি শ্রমবাজার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)। সংগঠনটির দাবি, দেশের স্বার্থ ও কর্মীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়া প্রয়োজন।

বায়রার নেতারা অভিযোগ করেছেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া ঘিরে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন পক্ষের তৎপরতায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর পারস্পরিক বিরোধ বা ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে মালয়েশিয়া বিকল্প সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়ে তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারে। তখন বাংলাদেশের জন্য এ বাজারের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বায়রার সদস্যরা। ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্তকরণ, সঠিক তথ্য উপস্থাপন ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বায়রার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর ভূঁইয়া।

মালয়েশিয়ায় বাড়ছে কর্মীদের আগ্রহ
বায়রার বক্তব্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। দেশটির সরকার বিদেশি কর্মীদের জন্য ন্যূনতম মূল বেতন ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত নির্ধারণ করেছে। বেতন, ভাতা ও ওভারটাইম মিলিয়ে একজন কর্মী মাসে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন বলে সংগঠনটির দাবি।

তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের তুলনায় এই আয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগ্রহও বেশি।

বায়রা আরও জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রেরণের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

কেন বন্ধ হয়েছিল নিয়োগ
মালয়েশিয়ার ইকোনমিক প্ল্যানিং ইউনিট নির্ধারিত ২৫ লাখ বিদেশি কর্মীর সীমা অতিক্রম করায় ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশসহ সব সোর্স কান্ট্রি থেকে বিদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয় দেশটি।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আগস্টে আবার সোর্স কান্ট্রিগুলো থেকে বিদেশি কর্মী নেওয়ার অনুমোদন দেয় মালয়েশিয়া সরকার। বায়রার অভিযোগ, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নেপাল ও মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশ দ্রুত কর্মী পাঠানো শুরু করলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সময়মতো প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয়নি।

সংগঠনটির দাবি, সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। তাদের হিসাবে, একই সময়ে বাংলাদেশ কর্মী পাঠানো শুরু করতে পারলে এরই মধ্যে অন্তত এক লাখ কর্মীর মালয়েশিয়ায় যাওয়া সম্ভব হতো।

৪২৩ এজেন্সির তালিকা থেকে ২৬ মূল, ৩১২ সহযোগী
বায়রার লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গত বছরের ২৭ অক্টোবর মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর তালিকা চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা পাঠায়।

এরপর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী দাতোশ্রী আনোয়ার বিন ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয় এবং দুই দেশ এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

পরবর্তী সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত কর্মী নিয়োগ শুরু করার তাগিদ দেন।

বায়রার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর ৪২৩টি এজেন্সির মধ্যে মানদণ্ড পূরণকারী ২৬টি মূল এজেন্সি এবং ৩১২টি সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সিকে প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে মালয়েশিয়া সরকার। এসব এজেন্সির মধ্যে বোয়েসেলও রয়েছে।

ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর মধ্যে কর্মী নিয়োগের জন্য কোটা বরাদ্দ শুরু হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া কর্মীদের জন্য অনলাইনে ই-অ্যাম্বাসি সফটওয়্যার মডিউলে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের এটেস্টেশনসহ পরবর্তী কার্যক্রম চলছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়েও অভিযোগ
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে ঘিরে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর একটি অংশের বিরুদ্ধে প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলেছে বায়রা। সংগঠনটির দাবি, মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক তালিকাভুক্ত নয়, এমন কিছু এজেন্সি বিভিন্ন সময়ে সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

বায়রার বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়, দুই দেশের সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও নির্ধারিত বিধিবিধান অনুসরণ করা হলেও কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী এজেন্সি মানব পাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের মতো মামলা-মোকদ্দমার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটিকে জটিল করার চেষ্টা করছে।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমোদন না থাকা কিছু এজেন্সি ‘ডামি ডিমান্ড লেটার’ ব্যবহার করে তালিকাভুক্ত এজেন্সির নামে ব্যবসা করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়। বায়রার দাবি, মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়েছে এবং পুরো শ্রমবাজারের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে মালয়েশিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ
বায়রার নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ও অন্যান্য পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কিছু শ্রমবাজার বন্ধ বা সংকুচিত হয়েছে। এ অবস্থায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাদের মতে, এখন রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থের বাইরে গিয়ে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং কর্মীদের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার বক্তব্য, মালয়েশিয়া দ্রুত কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিলে বাংলাদেশকে সমান্তরালভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশ কর্মী পাঠাতে না পারলে মালয়েশিয়া অন্য সোর্স কান্ট্রির দিকে ঝুঁকতে পারে।

তাই শ্রমবাজারটি দ্রুত উন্মুক্ত করে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরির দাবি জানিয়েছে বায়রা।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন আল আকাবা অ্যাসোসিয়েটের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান বিশ্বাস। এ সময় বায়রার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: দেশ রূপান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *