পরিবারের অভাব ঘোচাতে ধার-দেনা করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন বরগুনার ইসমাইল হোসেন (৪০)। বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ঋণও পুরোপুরি শোধ করতে পারেননি তিনি। এর মধ্যেই কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এখন স্বজনদের সামনে নতুন সংকট, প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না তার মরদেহ।
ইসমাইলের মরদেহ দেশে আনতে প্রায় তিন লাখ টাকা প্রয়োজন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। কিন্তু নিতান্তই অসচ্ছল পরিবারটির পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তার স্ত্রী সোনিয়া বেগম।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দর এলাকায় পাইপলাইন নির্মাণের জন্য খোঁড়া গভীর গর্তে কাজ করছিলেন ইসমাইল। এ সময় হঠাৎ মাটি ধসে পড়ে তিনি মাটির নিচে চাপা পড়েন। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
নিহত ইসমাইল হোসেন বরগুনা সদর উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আমজাদ হোসেনের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
ঋণ করে বিদেশযাত্রা
পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরবে পাড়ি জমান ইসমাইল। বিদেশে যাওয়ার খরচ মেটাতে তাকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ধার করতে হয়েছিল।
সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর শুরুটা সহজ ছিল না। কিছুদিন কাজ না পেয়ে বেকার থাকতে হয় তাকে। পরে এক নিকটাত্মীয়ের সহযোগিতায় রিয়াদ বিমানবন্দর এলাকায় একটি চীনা কোম্পানির অধীনে কাজ শুরু করেন।
কাজ পাওয়ার পর সংসারের দৈনন্দিন খরচে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বিদেশ যাওয়ার সময় করা ঋণের পুরোটা পরিশোধ করতে পারেননি ইসমাইল।
সকালে কথা, বিকেলে মৃত্যুর খবর
পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃহস্পতিবার সকালেও স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছিল ইসমাইলের। প্রতিদিনের মতো সেদিনও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে দুপুরে আবার ফোন দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু দুপুর পেরিয়ে গেলেও ফোন না আসায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন স্ত্রী সোনিয়া। পরে তিনি ইসমাইলের সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিকেল ৫টার দিকে তাদের কাছ থেকেই দুর্ঘটনার খবর পান তিনি।
সোনিয়া বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ওনার সঙ্গে কথা হতো। বৃহস্পতিবার সকালেও কথা হয়েছে। বলেছিলেন, দুপুরে আবার ফোন দেবেন। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও ফোন না আসায় আমি ওনার সহকর্মীদের ফোন করি। বিকেল ৫টার দিকে তারা জানান, ইসমাইল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।’
স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অনিশ্চয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওখানকার লোকজন বলছে, মরদেহ দেশে আনতে প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হবে। অভাবের সংসারে এত টাকা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমি সরকারের কাছে আমার স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাই।’
পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হলে সহযোগিতার আশ্বাস
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ আজিজ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেননি। পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।’
ইসমাইলের মৃত্যুতে পরিবারটিতে নেমে এসেছে শোক। একদিকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে মরদেহ দেশে ফেরানোর অর্থ জোগাড়ের দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে সময় কাটছে স্বজনদের।








